সাজ্জাদ হোসেন রিজু
গত ২৫ মার্চ করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রুখতে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পরই রাজধানীবাসীরা ঢাকা ছাড়তে শুরু করেন। ঢাকার ৪০ শতাংশ বাসিন্দা চলে যান নিজ গ্রামে। ঢাকার বস্তিবাসী আর দিনমজুর শ্রেণির লোক যারা গ্রামে ফিরে গেছে তাদের ভাগ্য ফেরাতে গ্রামেই তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর ‘একফালি জমিও যেন পড়ে না থাকে’ এই নির্দেশের কঠোর বাস্তবায়ন করতে কৃষিকাজের বিকল্প নেই। ফসল ও সবজি চাষ, মাছ চাষ, পশুপালন ও দুগ্ধখামারের মতো কর্মসংস্থানে মনোনিবেশ করতে হবে। গ্রামের নদী-নালা, পুকুর-ডোবা, হাওড়-বাঁওড়গুলোকে কাজে লাগাতে হবে। কাজে লাগাতে হবে অনাবাদি প্রতিখণ্ড জমি। রাজধানীতে এসে ভাসমান জীবনযাপন করার চেয়ে গ্রামে এধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া অনেক যৌক্তিক। তবে এজন্য গ্রামবাসীদের মানসিকতার পরিবর্তন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
কৃষিকাজের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের দিকেও আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে এরকম শিল্প যেমন:মৃিশল্প, কাঠের কাজ, বাঁশ ও বেতের কাজ, নকশিকাঁথা, তাঁতবস্ত্র ইত্যাদি। শুধু ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ওপর নির্ভর করে আছে ৩০ লাখের বেশি মানুষ। বর্তমানে বছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকার অবদান রেখে চলেছে এই শিল্প। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে এই শিল্পের যথেষ্ট কদর রয়েছে যা উপযুক্ত পৃষ্টপোষকতা পেলে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে আমাদের অর্থনীতিকে।
গ্রামে উত্পাদিত পণ্য যাতে সহজেই শহরে আসতে পারে, আবার গ্রামে যাতে কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত হয় সেজন্য বাজারজাতকরণের সহজিকীকরণের প্রতি আমাদের নজর দিতে হবে। ডেলিভারি চ্যানেলকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করতে এগিয়ে আসতে হবে ব্যবসায়ীগোষ্ঠীকে।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ইন্টারনেটের বিস্তৃতি জরুরি। পাশাপাশি ইন্টারনেট সহজলভ্য করা প্রয়োজন। অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে না পারলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে জাতীয় অবদানের জন্য শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সঙ্গে ই-কমার্সের যোগসূত্র অত্যন্ত নিবিড়। তৃণমূলে উত্পাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করবে ই-কমার্সের বিস্তৃতি। ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র এক্ষেত্রে বড়ো ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে ই-কমার্সকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
ঢাকা শহরে ১০ লাখের মতো মানুষ শুধু বস্তিতেই বসবাস করে, যাদের নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের একটি জরিপ বলছে—ঢাকায় হকার, দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালকসহ ৭০ লাখ থেকে এক কোটি মানুষ অস্থায়ী বাসিন্দা। এরা ঢাকা শহরে মানবেতর জীপনযাপন করে। এদেরকে গ্রামে পুনর্বাসন করা হলে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি ঢাকা শহরের ওপর থেকেও চাপ কমানো যাবে।
গ্রামাঞ্চলে কৃষিকাজ ও কুটির শিল্পভিত্তিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সরকার ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণগ্রহণের ব্যবস্থা চালু করেছে। মাত্র ৪ শতাংশ সুদে কৃষকরা ঋণ নিতে পারবেন যে কোনো ব্যাংক থেকে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। আমরা যদি বিকল্প ভাবতে না পারি তাহলে আবার সেই অতীতেই ফিরে যেতে হবে। করোনা আমাদের বিশ্বকে পিছনে ঠেলে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের বুঝিয়েছে যে, আমাদের কী করা উচিত ছিল।
ঢাকা
