এম এ আলআমিন
হংকংয়ের জন্য চীন নতুন জাতীয় নিরাপত্তা আইন করেছে, স্বশাসিত অঞ্চলটির অনেকেই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা এখন হংকং ছাড়ার চিন্তাভাবনা করছে। বিদেশি ও স্থানীয় সবাই চাইছে বেইজিংয়ের কোপানল থেকে দূরে থাকতে। গত বছর জুনে হংকংয়ের চীনঘেঁষা কর্তৃপক্ষ প্রত্যর্পণ বিল প্রণয়নের উদ্যোগ নিলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ২ সেপ্টেম্বর হংকংয়ের শীর্ষ নির্বাহী ক্যারি লাম প্রস্তাবিত আইনটি পুরোপুরি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। নভেম্বরে স্থানীয় নির্বাচনে গণতন্ত্রপন্থিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জেতে। তারপরও বিক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। এ বছর করোনা মহামারিতে পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত হয়ে আসে। কিন্তু ২৮ জুন চীনের পার্লামেন্টে জাতীয় নিরাপত্তা আইনটি পাশ ও ৩০ জুন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাতে অনুমোদন দেওয়ার পর অবস্থা আবারও গুরুতর হতে শুরু করে। আইনটি ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। ১৯৯৭ সালে ব্রিটেন যে মূলনীতির আওতায় হংকংকে চীনের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিল এ যেন তাতে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার মতো।
বিষয়টি হংকংয়ের অস্তিত্বের প্রতি প্রশ্ন চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। হংকংয়ের লোকজন এতদিন পর্যন্ত চীনের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য করতে পারত চীনের নিজস্ব আইনের বাইরে থেকেই। কিন্তু এখন তাদের বেইজিংয়ের প্রতি পুরোপুরি বশ্যতা স্বীকার করতে হচ্ছে। আইনটি কার্যকর হওয়ার থেকে দেশ ছাড়ার হিড়িক পড়েছে হংকংবাসীর মধ্যে। শহরের ৭৫ লাখ মানুষের প্রায় ৪০ শতাংশ বিদেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনেকেই এর মধ্যে হংকং ছেড়েছেন। অনেকে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে বসবাসরত উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশিদের বেশির ভাগই পাততাড়ি গুটিয়েছেন। হংকংয়ের আমেরিকান চেম্বার্স অব কমার্সের জুনে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে—বিদেশী ব্যক্তি ও কোম্পানিকে হংকং থেকে বিদায় করতেই মূলত ঐ আইন করা হয়েছে। হংকংয়ের দক্ষ জনশক্তির বাইরে কর্মসংস্থান করা কঠিন হবে না। সারা পৃথিবীই তাদের জন্য খুলে দিচ্ছে দুয়ার। ১৯৯৭ সালের আগে জন্ম নেওয়া হংকংয়ের প্রত্যেকের স্বয়ংক্রিয় ব্রিটিশ নাগরিকত্ব রয়েছে। তবে তারা ব্রিটিশ নাগরিক হলেও ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটেনে তাদের রেসিডেন্সি রাইট নেই। লেখাপড়া ও চাকরিসহ আরো কিছু অধিকার তাদের নেই। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সম্প্রতি বলেছেন, বিএনওধারীরা পূর্ণ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এর জন্য তারা ছয় বছর সময় পাবেন। তার প্রস্তাব হংকংয়ের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর ব্রিটেনে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করবে। হংকংয়ের হাজার হাজার মানুষের কানাডা অথবা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। আরো বেশি সংখ্যক হংকংবাসীকে নিতে দুটো দেশই এখন ভিসাপ্রক্রিয়া করার উদ্যোগ নিয়েছে। একই ধরনের পদক্ষেপ হংকংয়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও প্রতিবেশী জাপান ও তাইওয়ান। দক্ষ পেশাজীবীদের আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণে লক্ষ্যে টোকিওতে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে তাইওয়ান হংকংবাসীর সহায়তায় সরকারের পুরো একটি দফতর খুলেছে, যার নাম তাইওয়ান-হংকং সার্ভিসেস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অফিস। বসে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। বেইজিং জাতীয় নিরাপত্তা আইনটি করার পর দিনই কংগ্রেসে হংকং সেফ হারবার অ্যাক্ট অনুমোদিত হয়। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয়দলের সদস্যরা এতে সম্মতি দেন। এতে নিরাপত্তা আইনের জান্য দেশছাড়া হংকংয়ের বাসিন্দাদের শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে হংকংবাসীর সুবিধার্থে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এই দেশগুলোর পক্ষ থেকে বলা হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা মনে করেন, হংকংয়ের কেন্দ্রীভূত দক্ষ মানবসম্পদ কাজে লাগাতে চায় উন্নত বিশ্ব। যদিও চীনের প্রায় ১৪০ কোটি বাসিন্দা একদলীয় শাসনের পিষ্ট হচ্ছে, তাদের মুক্তমত প্রকাশ বা মানবাধিকার নেই তা সত্ত্বেও কোনো দেশ তাদের জন্য সেকেন্ড হোমের প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসেনি। কিন্তু হংকংয়ের অবস্থা ভিন্ন। এটি আগে থেকেই একটি ফিন্যান্সিয়াল হাব হিসেবে পরিচিত। কেবল আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, শিক্ষা, চিকিত্সা, ফ্যাশন, মার্চেন্ডাইজিং ও প্রকাশনাসহ নানা ধরনের পেশাদারী কাজের সেখানে রয়েছে অবারিত সম্ভবনা। বেশির ভাগ মানুষের ভাষাই ইংরেজি। যেটি বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আরো ঘনিষ্ঠ করেছে।
২০১৬ সালের এক হিসাবে দেখা যায়—হংকংয়ের ৭৩ লাখ বাসিন্দার মধ্যে ৫ লাখ ৭০ হাজারই চীনের বাইরে থেকে আসা অভিবাসী। সবচেয়ে বেশি এসেছে ফিলিপাইন থেকে (১ লাখ ৯০ হাজার) এরপর ইন্দোনেশিয়া থেকে (১ লাখ ৬০ হাজার)। নতুন যে আইনটি করা হয়েছে তা স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিবাসী সবাইর বেলাতেই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। একে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্ররোচনা, নাশকতা, সন্ত্রাসবাদ এমনকি বিদেশে বসে দেশের বিরুদ্ধে সমালোচনাকেও অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। যার সর্বনিম্ন সাজা তিন বছর কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন।
