করোনা টিকা কারা পাবেন?

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২০, ২১:৩৯

তালেব রানা

 

করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবের ছয় মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এই সময়ের ব্যবধানে বিশ্বে পাঁচ লাখ ৬৪ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন এক কোটি সাড়ে ২৬ লাখের বেশি। যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় এখন আক্রান্তের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। এই অবস্থায় মহামারি নির্মূলে একটি কার্যকর টিকার অপেক্ষায় বিশ্বের মানুষ।

কোনো টিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে সবার আগে গবেষকরা ভাইরাসটি বিশ্লেষণ করেন। তারপর ভাইরাসের উপাদান ও বাড়তি পদার্থ দিয়ে তারা সম্ভাব্য টিকা তৈরি করেন। এরপর তা পশুর ওপর প্রয়োগ করা হয়। তারপর মানুষের ওপর প্রয়োগ হয়। মানবদেহে পরীক্ষার পর দেখতে হয়, সেটা নিরাপদ কি না, শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে কি না এবং ঠিকঠাক কাজ করছে কি না। অবশেষে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেলে ব্যাপকহারে বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরু হয়। সেখানেও পার হতে হয় নানা ধাপ।

সাধারণত টিকা বা প্রতিষেধক তৈরির জন্য বেশ কয়েক বছর সময় লাগে। কিন্তু নতুন মহামারির চাপে টিকা আবিষ্কারের ছয়টি পর্যায় কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ করার তোড়জোড় চলছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিত্সক, গবেষক ও ওষুধ কোম্পানিগুলো টিকা আবিষ্কারে ১৬০টির বেশি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী অক্টোবরে পাওয়া যেতে পারে করোনার টিকা। সম্ভাব্য টিকা তৈরির দৌড়ে বেশ এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শীর্ষ বিজ্ঞানীরাও এটা বলছেন। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় অক্সফোর্ডের টিকার কার্যকারিতার বিষয়টি আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ জানা যাবে। পরীক্ষায় একবার সফলতার প্রমাণ পাওয়া গেলেই নিয়ন্ত্রকরা জরুরি ব্যবহারের জন্য এ টিকার অনুমোদন দিয়ে দেবে। অর্থাত্ অক্টোবরের মধ্যেই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মানুষরা এ টিকা পেতে পারেন।

অস্ট্রেলিয়ার নিউজ ডটকম ডটএইউ জানায়, অক্সফোর্ডের টিকা বিশ্বে দ্রুত সরবরাহের জন্য সাপ্লাই চেইন তৈরি করছে যুক্তরাজ্যের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী প্যাসকল সারিওট বলেন, এরই মধ্যে ২০০ কোটি ডোজ টিকা তৈরির অর্ডার পেয়েছেন তারা। প্রতি ডোজ টিকার দাম এক কাপ কফির দামের সমান হতে পারে। এ টিকা এক বছর পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে এর ফল জানা যাবে এবং অক্টোবরেই ভ্যাকসিন সরবরাহ শুরু করা যাবে।

অক্সফোর্ডের পরই মার্কিন সংস্থা ‘মডার্না আইএনসির তৈরি এমআরএনএ-১২৭৩ ভ্যাকসিন এগিয়ে আছে। ইতিমধ্যে তারা ক্যাটালেনট কোম্পানির সঙ্গে মিলে প্রাথমিকভাবে ১০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরির প্রস্তুতি নিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, কোনো মার্কিন কোম্পানি যদি প্রথম টিকা আবিষ্কার করে এবং উত্পাদনের পর বাজারে ছাড়ে তাতে প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের চাহিদাই পূরণ হবে না। তাই এখন বড়প্রশ্ন হচ্ছে, কারা এই টিকা প্রথমে পাবেন এবং তার সিদ্ধান্ত কীভাবে হবে? একটি বিষয়ে কিছুটা মতৈক্য হয়েছে যে, করোনায় আক্রান্তদের সেবায় নিয়োজিত সামনের সারির চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সবার আগে এই টিকা পাবেন। এরপর কারা পাবেন সেটা নির্ধারণে নীতি নির্ধারকদের চিকিত্সা গবেষকদের মতামত জানতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় নিলে কাজটি সহজ হতে পারে।

টিকা বিতরণ হতে হবে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা ও স্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে। আক্রান্তের হার, ঝুঁকি, প্রয়োজনের তথ্য-উপাত্তই নিশ্চিত করতে পারে কোথায় কি পরিমাণ টিকা বিতরণ করা জরুরি। টিকা বিতরণের ক্ষেত্রে অবশ্যই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে। বিশেষ গোষ্ঠী বা বিশেষ জাতির জন্য নয় বরং সব শ্রেণির মানুষের জন্য বৈষম্যহীনভাবে বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বিশ্বের সব দেশের জন্যও জরুরি।

অনেকের শঙ্কা ধনী দেশগুলো এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে। প্রথমদিকে গরিব দেশগুলো টিকা পাবে না। এই আশঙ্কা থেকে করোনা টিকাকে বৈশ্বিকভাবে সর্বসাধারণের সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য সম্প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ১৯ জন নোবেলজয়ীসহ বিশ্বের শতাধিক নেতা।