শুদ্ধ রাজনীতির বাতিঘর আশরাফের অভাব পূরণ হবার নয়

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:২৬

 ‘ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময় যখন রাজনীতির টালমাটাল অবস্থা, আওয়ামী লীগে যখন ভাঙন অনিবার্য হয়ে ওঠে, দল থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে মাইনাস করতে দলের কিছু সিনিয়র নেতা ষড়যন্ত্রের পন্থা অবলম্বন করেছিলেন, তখন সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমান ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলামই আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন। শুদ্ধ রাজনীতির বাতিঘর সৈয়দ আশরাফের ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে ভূমিকা ছিল অনন্য। বড় ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। দলমত-নির্বিশেষে সবাই ব্যক্তি সৈয়দ আশরাফকে পছন্দ করতেন।’ গতকাল শুক্রবার সৈয়দ আশরাফের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তার সহযোদ্ধারা ইত্তেফাককে এ সব কথা বলেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই শোকে কাতর হতে হলো আওয়ামী লীগকে। লাখো ভক্ত অনুরাগীকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ফুসফুসের ক্যান্সার নিয়ে থাইল্যান্ডে চিকিত্সাধীন ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সজ্জন, ত্যাগী, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফের শারীরিক অবস্থার প্রায়ই খোঁজ খবর রাখতেন। তার চিকিত্সার পুরো ব্যবস্থা প্রধানমন্ত্রী নিজে করেন। হাসপাতালে থেকেই একাদশ সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন আশরাফ। বৃহস্পতিবার নতুন এমপিদের শপথ অনুষ্ঠানের পর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী জানিয়েছিলেন, শপথের জন্য সময় চেয়ে আশরাফ চিঠি দিয়েছেন। তিনি দেশে ফিরে শপথ নিতে চেয়েছেন। কিন্তু তার আর শপথ নেওয়া হলো না। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে ১০টায় মারা যান তিনি। আজ শনিবার সন্ধ্যায় সৈয়দ আশরাফের মরদেহ দেশে আসছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে সৈয়দ আশরাফের মরদেহ হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপির নেতৃত্বে দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দ তার মরদেহ গ্রহণ করবেন। সন্ধ্যা ৭টায় সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মরদেহ ২১ বেইলি রোডস্থ তার সরকারি বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে মরদেহ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হবে। আগামীকাল রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর হেলিকপ্টারযোগে মরদেহ কিশোরগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হবে এবং দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়াম মাঠে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। মরহুমের তৃতীয় নামাজে জানাজা দুপুর ২টায় ময়মনসিংহের আঞ্জুমান ঈদগাঁ মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। অতঃপর হেলিকপ্টারে করে মরদেহ ঢাকায় এনে বাদ আছর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে।

সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টুসহ দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তার মৃত্যুতে পূর্বঘোষিত ছাত্রলীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর চার দিনব্যাপী কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল ছিল ছাত্রলীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শুক্রবার জুমার পর ছাত্রলীগের সব সাংগঠনিক ইউনিটে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে কিশোরগঞ্জসহ সারাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শুক্রবার জুমার নামাজের পর কিশোরগঞ্জের সব মসজিদে দোয়া করা হয়।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সৈয়দ আশরাফের মতো ত্যাগী, বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও সজ্জন রাজনীতিকের শূন্যতা ‘কখনোই পূরণ হওয়ার নয়’। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, তার নীতি, আদর্শ, বিনয়, চরিত্রের যে গুণাবলি, সেগুলো আমাদের পাথেয় হবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, দল ও নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যেভাবে নির্লোভ ও সত্ভাবে জীবনযাপন করেছেন, তা সচরাচর দেখা যায় না। সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, সৈয়দ আশরাফই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে ‘বুদ্ধিদ্বীপ্ত’ ছিলেন। আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, সৈয়দ আশরাফের ব্যক্তি জীবনে কোনো চাওয়া-পাওয়া ছিল না। আওয়ামী লীগের ক্রান্তিকালে বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেন-এ আশরাফ ভাইয়ের ভূমিকা ছিল অনন্য। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু এক যৌথ বিবৃতিতে শোক জানিয়ে বলেন, তাঁর মৃত্যুতে দেশ হারাল মহত্প্রাণ ত্যাগী দেশপ্রেমিক একজন রাজনীতিবিদকে।