নারীর কষ্ট চিরায়ত। নারীর এই চিরায়ত কষ্টের রূপ তাই ফুটে ওঠে শিল্পের নানা মাধ্যমে। চিত্রকর তার ছবির মধ্যে ফুটিয়ে তোলেন নারীর করুণ পরিণতির চিত্র। গল্পকারের বয়ানে স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতে থাকে নারীর দুঃখ-কষ্টের ছবিগুলো। আর নাট্যকারের বয়ানগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ধরা দেয় দর্শকের সামনে নির্দেশকের সৃজনে। নাটকে নারীর এমন দুঃখ কষ্টের বয়ানে আমরা ব্যথিত হই কিন্তু মস্তিষ্কে তা কতটা পরিবর্তন আনতে পারে সেটাই মূল কথা। নারীর করুণ পরিণতি বা সামগ্রিকভাবে তাদের জন্য সমাজের নানা স্তরে নানা আইনকানুন তৈরি হলেও আদতে মানসিক পরিবর্তন ছাড়া তা কি আদৌ দূর করা সম্ভব? সম্ভব হইনি আজও। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা একেবারেই ভিন্ন। আর সেই ভিন্ন আর্থ সামাজিক অবস্থার কারণেই নারী যুগে যুগে আমাদের দেশে অবহেলিত। নারী নির্যাতিত। নারী পুরুষের ভোগ বা বিলাসিতার বাসন। নারীর সেই চিত্র এখনো বর্তমান তবে হয়তো শুধু আদল পরিবর্তন হয়েছে।
আজ থেকে প্রায় তিনশ বছর আগে ময়মনসিংহ গীতিকায় যেসব নাটক বা গীত রচিত হয়েছে তার প্রায় সবগুলোতেই বর্ণিত হয়েছে নারীর দুঃখ-যন্ত্রণার কথা। প্রায় তিনশ বছরের পুরনো লোককাহিনি ‘নছর মালুম এবং ভেলুয়া সুন্দরী’ অবলম্বনে নাট্যকার এসএম সোলায়মান রচনা করেছেন এক নতুন নাট্য ‘আমিনা সুন্দরী’। এসএম সোলায়মানের আমিনা সুন্দরীর সাথে বিয়ে হয় নছর মালুমের। নছর জাহাজের মালুমের কাজ বাদ দিয়ে স্বাধীন ব্যবসা করার জন্য বার্মা (মিয়ানমার) দেশে যায়। বাণিজ্য করতে গিয়ে তার আর খোঁজ থাকে না। নছরের অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে আমিনার কেটে যায় দশটি বছর। এই দশ বছর আমিনা সুন্দরীকে সহ্য করতে হয় নানান লাঞ্চনা-গঞ্জনা-অপমান। নানা লোকের কুনজর পড়ে সুন্দরী আমিনার ওপরে। এছাক সওদাগরের সাথে বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লাগে আমিনার বাবা-মা। কবিরাজের তাকতুক খাটিয়েও কোনো কাজ হয় না। আমিনা সুন্দীরর মন কেউ গলাতে পারে না। এদিকে বার্মা দেশে নছর মালুম বিয়ের কথা গোপন রেখে বিয়ে করে এখিনকে। আমিনার বাবা মারা গেলে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয় সে। আশ্রয় পায় এক বৃদ্ধের বাড়িতে। আশ্রিত বাবাও চায় মেয়ে আমিনা সুন্দরীকে বিয়ে দিতে কিন্তু আমিনার যে প্রতিজ্ঞা তা ভাঙতে পারে না কেউই। দ্বিতীয় বিয়ে সে কিছুতেই করবে না। আমিনা সুন্দরীর এমন প্রতিজ্ঞাই স্পষ্ট করে দেয় বাংলার নারীর চিরায়ত রূপ বৈচিত্র্য। নছর মালুম এদিকে বাণিজ্য করতে গিয়ে ডাকাতের কবলে পরে হারিয়ে ফেলে সর্বস্ব। দেশে ফিরে সে আমিনা সুন্দরীকে বাড়িতে পায় না। ফিরে যায় বার্মায়। আশ্রিত বৃদ্ধ পিতার বাড়িতে থাকতেই একদিন ভোলা সওদাগরের নজরে পরে আমিনা সুন্দরী। ভোলা সওদাগর তাকে তুলে নিয়ে যায় নিজের বাড়িতে। বিয়ে করতে চায় আমিনাকে কিন্তু আমিনার সেই পণ। কৌশলে সে ভোলা সওদাগরের কাছ থেকে সময় নেয় বার মাস। নানা কৌশলে সে তার সতীত্ব টিকিয়ে রাখে। বার মাস পেরিয়ে গেলে ভোলা সওদাগর তাকে বিয়ে করতে চায় জোর করেই। এদিকে আবার বার্মা ফিরে গিয়ে নছর মালুম দেখতে পায় এখিনের নতুন স্বামীকে। নছরের আগের বউয়ের কথা জানতে পেরে এখিন তাকে তালাক দিয়ে নতুন সংসার পেতেছে। ভোলা সওদাগরের বেধে দেওয়া বার মাস পূর্ণ হলে নছর মালুমও ঘটনাক্রমে চলে আসে সওদাগরের বাড়িতে। স্ত্রীকে ফিরে পেতে নালিশ জানায় কাজীর কাছে আর সতীত্বের প্রশ্ন তোলে আমিনার কাছে। আমিনার মনে হয় পুরুষের সতীত্ব নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না! হায়রে নারী! কাজী বিচার করে ভোলা সওদাগরকে সাত বছরের জন্য জেল দেয় কিন্তু আমিনা সুন্দরীকে নছরের কাছে ফিরিয়ে দেয় না। আকাশের সাদা কালো মেঘের মতো সুন্দরী আমিনার ভাগ্য ভাসতে থাকে এক আকাশ থেকে আরেক আকাশে।
থিয়েটার আর্ট ইউনিটের এই নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন যারা তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজরে আসে গায়েন সেলিম মাহবুবের দক্ষ অভিনয় ও গায়কী। প্রাণবন্ত অভিনয় করেন এছাক, নছর মালুম ও মুনাফ চরিত্রে সুজন, সাইফ সুমন ও চন্দন রেজা। বাকি অভিনেতা অভিনেত্রীরাও বেশ ভালো অভিনয় করেন তবে গত ৯ নভেম্বরের সন্ধ্যায় আমিনা সুন্দরীর অভিনয় কিছুটা দুর্বল মনে হয়েছে এবং এখিনের চরিত্রে অভিনয় করা সংগীতা চৌধুরীকে কোথাও কোথাও দলছুট মনে হয়েছে। সেলিম মাহবুবের অসাধারণ সংগীত পরিকল্পনা ও রোকেয়া রফিক বেবীর নির্দেশনায় এসএম সোলায়মানের আমিনা সুন্দরী একটি অনন্য সাধারণ নাটক।
