একজন কবির কাছে তার প্রতিটা কবিতাই শ্রেষ্ঠ। একটা কবিতা লেখা হয়ে গেলে পরে ওই কবিতাটিকে আরেকটি নতুন কবিতা লেখার আগপর্যন্ত বুক দিয়ে আগলে রাখেন। বুকপকেটে, কখনো কাঁধের ঝোলাবেগে, কখনো বা কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে সংরক্ষণ করেন। অতঃপর খসড়া কবিতাকে ঘষামাজা করে একটা ধোপদুরস্ত প্যাটার্নে দাঁড় করিয়ে শেষে স্বস্তি। তাই বলছিলাম—কবির কাছে তার সব কবিতাই প্রিয়। সব কবিতাই শ্রেষ্ঠ। তারপরও কথার ফাঁক গলিয়ে কথা এসে যায়। যে কথার কানেকাতে, ফুল্কায় ঝলকানি দিয়ে ওঠে রৌদ্রকিরণ। আর ওই কিরণের আলোর প্রপাতে কিছু কবিতা নিজের আলস্য ভেঙে জেগে ওঠে ভোরের কহ্লারের মতো। কহ্লারের মতো ওই কবিতাই একটা ভিন্ন ইমেজ, ভিন্ন ডাইমেনশন নিয়ে নিজেদের ছাড়িয়ে গিয়ে চিবুকের ভাঁজে শ্রেষ্ঠত্বের পেট্রোম্যাক্স জ্বেলে সন্ধ্যার সুনসান স্ট্রিটে ঝাপসা মেঘের মতো ঘুরে বেড়ায়।
পঞ্চাশের দশকের পর থেকে অদ্যাবধি অনেক কবিরই এমন চন্দ্রাঙ্কিত মেঘেডোবা কবিতা নিয়ে বেরিয়েছে শ্রেষ্ঠ কবিতাগ্রন্থ। আলোচ্য গ্রন্থটিও এমন এক ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। কবি বুলান্দ জাভীর। আশির দশকের অন্যতম প্রধান কবি।
স্যুররিয়েলিজমের এক বিনম্র টোন তার কবিতাকে দিয়েছে বিশিষ্টতা। কখনো কখনো তার কবিতা ট্যুরিস্টের মতো পাঠককে পরিভ্রমণ করিয়ে আনে সমুদ্র, পাহাড়, অরণ্য, মাঠ, নদী, নস্টালজিক কৈশোর আর তারুণ্যের পাতাঝরা আবছায়া পথ।
যে পথের শেষ মাথার কুয়াশাডোবা বাড়ির রেলিংয়ে ঝুঁকে থাকে কোনো এক কিশোরীর বৃষ্টির গুঁড়োজ্বলা রুপোঝুড়ি অ্যাপ্লিকের কারুকার্যময় নির্জন বিকেল। কবি বুলান্দ নিরন্তন ভালোলাগার মতো কবিতাই রচনা করে আসছেন। কবি বুলান্দ জাভীর স্বকীয় শৈল্পিকতায় ইতোমধ্যে এক নিজস্ব স্বরের অভিনিবেশ করেছেন। বুলান্দ জাভীরের কবিতায় নগরজীবনের গল্প যেমন সাবলীলভাবে এসেছে, তেমনি নৈসর্গিক কনসেপ্টের ভায়োলিনও বেজে ওঠে থেমে থেমে। গুঞ্জরণ জাগা বলরুমে উদ্বেল ব্যালেরিনাদের বুকে বুকে যে নিঃসঙ্গ ক্রন্দনের তরঙ্গ আছড়ে পড়ে মোজাইক জ্বলা ফ্লোরে আর পিয়ানোর সকরুণ স্বরের মিহিন মোড়ে মোড়ে—বুলান্দ জাভীরের কবিতার পঙিক্ত, শব্দ, উপমা, চিত্রকল্প, উেপ্রক্ষা অঝোর বৃষ্টির মতো ঝরে। নিদারুণ আবেগমথিত স্ফুরণে বুলান্দ জাভীরের বাছাইকৃত শ্রেষ্ঠ কবিতার ঝাউবাগানে স্থলপদ্মের খোঁজে গিয়ে কবি লেখেন—‘স্বপ্নের নীল কুয়াশায় ঝাপসা তোমার মুখ আসে/ স্পর্শের মধ্যে যে নয়/ চাইলেই অবাধ্য ঘোড়ার মতো যায়/ গহন কপাট ছেড়ে সীমাহীন দূর অন্তপুরে/ শুধু আসে যায়/ স্বপ্নের ভেতর আলতো পায়/ টুল বেঞ্চি মাতানো সময়/ বন বাছাড় তোলপাড় করা দিন/ (স্থলপদ্মের জন্য রোদন)’। উল্লিখিত কবিতাটিতে চিত্রকল্পের এক অনবদ্য ইশতেহার জেগে উঠেছে।
কখনো তার কবিতার ভেতর ঘুরে যায় নিঃসঙ্গ ট্রেনের নির্জন ব্যুফে কারের টেবিলে মুখোমুখি বসা উষ্ণ বার্গারের মতো নিদাঘ দুপুর কিংবা তার কবিতার রানওয়েতে থামে এসে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাডোবা মেঘের অ্যারোফ্লট। আর এয়ারহোস্টেজের স্লিভলেস উজ্জ্বল বাহুর মতো ভোরের লাউঞ্জ বুলান্দের কবিতার রেশমি কিংখাবে জেগে ওঠে স্বর্ণোজ্জ্বল শিশিরের ঝলকানি নিয়ে। মধ্যরাতের বিজন পেভমেন্টের মতো বুলান্দ জাভীরের কবিতা কখনো কখনো এক রহস্য নিবিড় নৈঃসঙ্গের পাতা যায় ঝরিয়ে। নক্ষত্রের মার্বেল ছড়িয়ে যেতে যেতে কবি বুলান্দ জাভীর তার শ্রেষ্ঠত্বের সুবাস যান বিছিয়ে অনর্গল। আর এখানেই কবি বুলান্দ জাভীরে সমকালীন বাংলা কবিতার আরশিতে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন নিজেরই প্রতিবিম্ব। ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বুলান্দ জাভীরের স্বকীয়তাকে আরো স্পষ্ট করেছে। করেছে উজ্জ্বলতর।
‘বুলান্দ জাভীরের শ্রেষ্ঠ কবিতা’
প্রকাশক :আলোঘর প্রকাশনী
প্রচ্ছদ :মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশকাল নভেম্বর : ২০১৯
দাম : ২৫৫ টাকা
