আশিক ভাই চাকরি করে যে কয় টাকা আয় করেন, তার পুরোটায় ব্যয় করেন সংগীত সাধনার পিছনে। তার ধারণা সুযোগ পেলে তিনি দেশ সেরা শিল্পীদের একজন হবেন। আশিক ভাইয়ের এই সংগীত চর্চার কারণে পরিবারে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফুফাতো ভাইয়ের এই পাগলামি কমানোর দায়িত্ব পড়ল আমার ঘাড়ে। একদিন বড় ফুফু আমাকে ফোন করে বললেন, ‘বাবা, আশিক তোমাকে অনেক পছন্দ করে। তুমি ওকে একটু বুঝিয়ে বলো, গান সবার কণ্ঠে মানায় না।’
—আমার কথা শুনবে না ফুফু। ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেলে সারা রাত বসিয়ে গান শোনাবেন। আমি বরং তাকে ছুটির দিনে বাড়ি যেতে বলি। আপনি তাকে বুঝিয়ে বলেন।
ফুফু চিত্কার দিয়ে উঠলেন, ‘না না বাবা। এই কাজ ভুলেও করবে না। গত সপ্তাহে আশিক বাড়িতে এসেছিল। রাতভর তার গানের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে।’
—বলেন কী?
—কী করব বাবা। গান শেষ হতেই আশিক জিজ্ঞেস করে, আম্মা গান কেমন হয়েছে? বাসার সবাই হাসাহাসি করছে। আমি মা হয়ে তো ছেলের গানকে খারাপ বলতে পারি না। তাই বলেছিলাম ভালো হয়েছে বাবা। আজকের মতো আসর বন্ধ করে শুয়ে পড়।
—তারপর কী হলো?
—এই কথা শুনে আশিক তো মহাখুশি। সে একের পর এক বেসুর গলায় গান গেয়ে যাচ্ছে। দুই-তিনটা গানের পর সবাই চলে গেল। কিন্তু আমাকে আর উঠতে দিলো না। এভাবে শেষ রাত পর্যন্ত আমাকে গানের যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে।
আমি বললাম, ‘ফুফু ভাইকে একটা বিয়ে করিয়ে দেন। সংসারের ঝামেলায় সংগীত চর্চা বন্ধ হয়ে যাবে।’
—তোমার বুদ্ধিটা খারাপ না। তাহলে দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তুমিও আশিককে বিয়ের বিষয়টা বল।
—ঠিক আছে ফুফু ভালো থাকবেন। আজ তাহলে ফোন রাখি।
দুই.
কয়েক মাসের মধ্যেই আশিক ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। মেয়ে দেখতে বেশ সুন্দরী। উভয় পক্ষই সিদ্ধান্ত নিলেন ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান করবেন। বিয়ের তিন-চার দিন আগে আশিক ভাই ফোন দিয়েই বললেন, ‘আমার বিয়েতে তোর প্রধান দায়িত্ব সাউন্ড সিস্টেম ম্যানেজ করা।’
আমি জানতে চাইলাম, ‘কেন?’
আশিক ভাই বললেন, ‘সবাইকে চমক দেওয়ার জন্য বিয়েতে আমি গান করব।’
—কী বলেন ভাই। নিজের বিয়েতে কেউ গান করে। লোকে কী বলবে?
আশিক ভাই হেসে বললেন, ‘এটাই হবে কনে পক্ষের জন্য চমক। তুই মেয়ের ভাইকে বলবি যেভাবেই হোক সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা করতে। আর সাথে অবশ্যই একটা কর্ডলেস (তার বিহীন) মাইক্রোফোন।’
—আমি বিষয়টা কনের বড় ভাইকে জানালাম। উনি অবশ্যই প্রথমে রাজি হতে চাননি। যখন শুনলেন আমাদের মাঝে অনেক প্রতিভাবান শিল্পী ওইদিন গান করবেন, তখন রাজি হয়ে গেলেন।
তিন.
শহরের একটা কমিউনিটি সেন্টারে আশিক ভাইয়ের বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। বর আর কনে পক্ষ মিলে হাজার মানুষের সমাগম হলো। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে রাত ৯টা বেঝে গেল। খাওয়াদাওয়া শেষ হলে আমরা বউ নিয়ে বাসায় ফিরব। ঠিক তখন আশিক ভাই আমাকে দূর থেকে ইশারায় ডাকলেন। কাছে যাওয়ার পর ফিসফিস করে বললেন মাইক্রোফন দেওয়ার জন্য। তিনি গান গাইবেন। বিয়ের আসরে তর্ক না বাড়িয়ে আমি আশি ভাইয়ের হাতে মাইক্রোফোন দিলাম। ভাই বললেন সাউন্ড নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রের কাছে গিয়ে বসতে। আমি একটা চেয়ার নিয়ে স্পিকারের কাছে বসলাম।
সবাইকে চমকে দিয়ে আশিক ভাই গান ধরলেন, ‘ভালবাসিয়া গেলাম ফাঁসিয়া...।’
উভয় পক্ষের মেহমানদের হাসি আর কাশিতে পুরো হল এক হয়ে গেল। ছোট বাচ্চারা পর্যন্ত হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে। ভাই ইশারা দিলেন সাউন্ড বাড়িয়ে দিতে।
আমি বিরক্ত হয়ে তার কাছে গিয়ে কানে কানে বললাম, ‘ভাই সাউন্ড বাড়ালে সমস্যা হবে। সবাই হাসাহাসি করছে। আপনি গান বন্ধ করেন।’
আশিক ভাই গান শেষ করে আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘এত মানুষ আমি কোথায় পাব একসাথে। তুই স্পিকারের কাছে গিয়ে বস। সময়মতো সাউন্ড বাড়াবি কমাবি।’
আমি চুপচাপ স্পিকারের কাছে গিয়ে বসলাম। ভাই এবার ইংরেজি ‘ইটস মাই লাইফ’ গানটি শুরু করলেন।
আমি স্পিকারের সাউন্ড পুরোটাই বাড়িয়ে দিলাম। পুরো হলজুড়ে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। কনের ভাই গিয়ে আশিক ভাইকে গান বন্ধ করতে বললেন। ভাই কর্ণপাত করলেন না।
পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। হঠাত্ হলের লাইট নিভে গেল। কয়েকজন প্লাস্টিকের চেয়ার দিয়ে বর পক্ষের লোকজনকে এলোপাতারি মারধর শুরু করল। আমার পিঠের ওপর দিয়েও কয়েক দফা চলল। আমি সাউন্ড সিস্টেম রেখে প্রাণ রক্ষায় দৌড় দিলাম। যতক্ষণ কানে গানের শব্দ আসছিল ততক্ষণ দৌড় বন্ধ করিনি। g
