g সত্যজিত্ বিশ্বাস
ফেল্টুস ছাত্র কোনোমতে প্রমোশন পেয়ে পেয়ে স্কুল, কলেজ টপকাতে পারলে খুশিতে কেমন করে, মোশাররফ তা জানে। সেই ছেলে যখন চাকরিও জুটিয়ে ফেলে তখন খুশিতে আত্মহারা হয়ে কেমন করে, তাও সে জানে। জানবে নাই বা কেন? এসবই তো তার নিজের সঙ্গেই হয়েছে। আজ মোশাররফ ওরফে মশা তারচেয়েও খুশি। অফিসে বসে পা দোলাতে দোলাতে গান গাইছে আর কাজ করছে। মাঝে মাঝেই আনন্দে লাফিয়ে উঠে আবার বসে পড়ছে।
‘লাফাচ্ছেন কেন?’ ডিপার্টমেন্টাল হেড ফারুক সাহেব পিছন থেকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
‘আনন্দে স্যার, আনন্দে।’
‘আনন্দে লাফাতে হয় বুঝি?’
‘এটা কী বললেন স্যার? শুধু মানুষ কেন প্রাণীরাও তো আনন্দিত হলেই লাফায়। ব্যাঙ থেকে শুরু করে গরু, ছাগল, গাধা, ঘোড়া কে লাফায় না বলেন?’
‘তাই নাকি?’
‘অবশ্যই তাই। ওদের তো আর মুখে ভাষা নেই যে কিছু বলে সেই আনন্দ প্রকাশ করবে, তাই লাফিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে।’
‘কিন্তু আপনার মুখে তো ভাষা আছে। আপনার লাফানোর কারণটা কী?’
‘আমি লাফাচ্ছি স্যার মহাআনন্দে। এমন আনন্দের খবর জীবনে একবারই আসে। আমি পেয়ে গেছি স্যার।’
‘কী পেয়েছেন, লটারির টিকিট?’
‘জি না স্যার, তারচেয়েও বড় কিছু।’
‘কী সেটা?’
‘খবর।’
‘কী খবর?’
‘আগামী বৃহস্পতিবারে বাড়ি যাওয়ার জন্য জরুরি খবর এসেছে।’
‘তো? এর আগে কী কখনো বাড়ি থেকে ডাক আসেনি? আপনি কি আর বাড়ি যাননি?’
‘এবারের ডাক অন্য রকম ডাক। আমি টের পেয়েছি, স্যার।’
‘কী টের পেয়েছেন?’
‘এই ডাক, আমার বিয়ের ডাক।’
‘তাই নাকি? তা, কী করে বুঝলেন?’
‘আব্বা ফোন করে বলছে শুক্রবারে উত্সব হবে। আমি যেন বৃহস্পতিবারের মধ্যে অবশ্যই বাড়ি যাই।’
‘মানুষ তো বিয়ের পরে লাফায়, আপনি আগেই লাফাচ্ছেন?’
‘ইয়ে মানে আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে তো তাই। কতবার ইনিয়ে বিনিয়ে আম্মাকে বিয়ের কথা বলেছি, পাত্তাই দেয়নি। এবার তাই সব ঠিকঠাক করেই আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য ডাক পাঠিয়েছে। স্যার, আমাকে কিন্তু তিনদিনের ছুটির ব্যবস্থা করে দিতেই হবে।’
বিয়ে পাগলা মোশাররফের কথা শুনে ফারুক সাহেব মুচকি হেসে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন।
অফিস শেষ করে রোজকার দিনের মতো মেসের দিকে পা বাড়ায় না মোশাররফ ওরফে মশা। গাউছিয়ার মোড়ের পাশ দিয়ে হাঁটে আর আড়চোখে তাকিয়ে মহিলাদের টুকটাক কেনাকাটা দেখে। না দেখা, না জানা হবু বউয়ের জন্য কী কিনবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। মশা সরল সোজা হতে পারে কিন্তু বোকা না। জামাকাপড় কিনতে যে সাইজ লাগে এটা সে বোঝে। তাই বুদ্ধি করে শাড়ির দোকানের দিকে যায়। অনেক দামাদামি করে একটার জায়গায় দুইটা শাড়ি কিনে ফেলে।
দোকানী মুচকি হাসি দিয়ে বলে, ‘এক শাড়ির দামে দুই শাড়ি পেয়ে গেলেন। আপনি জিতছেন ভাই, আপনি শাহী জিতা জিতছেন। ভাবি খুব পছন্দ করব, দেইখেন।’
কথাটা খুব ভালো লাগে তার। ইচ্ছে করে আরও একশ টাকা বেশি দিয়ে দিতে। বিয়ের ঘোরের ঠেলায় ঘুরতে ঘুরতে নববধূর জন্য স্নো, পাউডার, লিপস্টিক, নেলপলিশও কিনে ফেলে। কেনাকাটা শেষ করে প্যাকেটগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই নিজে বিড়বিড় করে বলে, আপনি জিতছেন ভাই, আপনি জিতছেন!
সব নিয়ে মেসের পথে হাঁটতে হাঁটতে নতুন বউয়ের কথা ভেবে শিহরিত হয় মশা। আনন্দের ঠেলায় লাফ দিয়ে উঠতেই বাধে বিপত্তিটা। রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো পুলিশ সার্জেন্ট ইশারা করে কাছে ডাকে, ‘কী ব্যাপার লাফ দিলেন কেন?’
‘স্যার, আনন্দে।’
‘কীসের আনন্দে? চুরির?’
‘কি যে বলেন স্যার, আমি চুরি করতে যাব কেন?’
‘ওরে বাবা? সাধু পুরুষ? তোর হাতে কিসের ব্যাগ? ব্যাগের ভিতর কী, দেখি?’
‘আপনি আমাকে তুই করে বলছেন কেন?’
‘চোরকে তুই করে বলব না তো কী আপনি করে বলব? বল, ব্যাগের ভেতর কী?’
‘ব্যাগের ভেতর শাড়ি।’
‘আচ্ছা এই ব্যাপার। নতুন শাড়ি দোকান থেকে চুরি করছিস।’
‘কী বলেন, চুরি করতে যাব কেন?’
‘শাড়ি কিনছিস, দোকানের মেমো দেখি।’
‘মেমো তো আনি নাই, স্যার।’
‘তা আনবি কি করে? চুরি করলে কেউ মেমো দেয়?’
‘এটা আমার, চুরি করতে যাব কেন?’
‘এটা তোর? তুই কি মহিলা? শাড়ি পড়িস?’
‘আমার মানে আমার বউয়ের জন্য বিয়ের শাড়ি কিনেছি।’
‘নিজের বউয়ের জন্য আবার বিয়ের শাড়ি কিনেছিস? কি টেনে এসেছিস, গাঁজা না বাংলা?’
‘না মানে বিয়ে করব তো, তাই নতুন বউয়ের জন্য বিয়ের শাড়ি কিনেছি।’
‘বিয়ে হয়নি তাহলে?’
‘জি না স্যার। আবেগে বউ বলে ফেলেছি। এই যে দেখেন স্নো, পাউডার, লিপস্টিক, নেলপলিশ। আপনিই বলেন, শাড়ির দোকানে কি এসব পাওয়া যায়? তাও যদি বিশ্বাস না করেন, আমার আব্বার সাথে মোবাইলে কথা বলেন।’
‘যা ভাগ এখান থেকে। কই থিকা যে এইসব জিনিষ ঢাকা শহরে আইসা উঠে।’
বিরাট বড় ফাঁড়া থেকে বাঁচার আনন্দে লাফ দিতে গিয়েও দেয় না মশা। শুধু রাতে মেসে ফিরে বড় একটা ব্যাগে নতুন বউয়ের জন্য সব কাপড়, প্রসাধনী ঢুকিয়ে প্যাকেট করে রুমের দরজা লাগিয়ে তারপর জোরে একটা লাফ দেয়। আসন্ন উত্সবের আনন্দে মনটা ভরে যায় তার।
অপেক্ষার পালা শেষ হয় একসময়। চলে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। বাস যতই বাড়ির দিকে যায় মশার মনে হয় ততই যেন উত্সবের আনন্দে ঝলমল করছে চারপাশ। শুধু তাই না। বাস থেকে নেমে দেখে বাজারে লোকজন গমগম করছে। ওকে দেখেই পরিচিত মুরব্বিরা ডাক দেয়, ‘আসছ বাজান? তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও, তোমার আব্বাজান অস্থির হইয়া আছে।’
লাজুক হাসি দিয়ে সবাইকে সালাম দিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ায় মশা। নানারকম ব্যানার আর ফেস্টুনে চারপাশ সাজানো। মশা মনে মনে ভাবে, তার আব্বা কী পাগল হয়ে গেল নাকি? বাজার থেকে শুরু করে বাড়ি পর্যন্ত কেউ এত সাজায়? এত মানুষকে কেউ দাওয়াত দেয়? লজ্জায় লাল হয়ে বাড়িতে ঢোকে।
পরদিন শুক্রবার। উত্তেজনায় সারারাত ঘুম হয়নি। ভোরে চাপা উত্তেজনা আর ধরে না রাখতে পেরে এক নিঃশ্বাসে বলে যায়, ‘কী ব্যাপার ফোনে এত জিগাইলাম, তখন তো কিছুই কইলা না। অফিসে তো ছুটি দিতেই চায় না। জোর কইরা ছুটি লইয়া আইছি, এখন কও।’
উত্তর দেয় মশার আম্মা। ‘তোর আব্বার শখ, আজকের উত্সবে আমরা সবাই সক্কাল সক্কাল একলগে যামু।’
মশা লাজুক হাসিতে মাথা নীচু করে জিজ্ঞাসা করে, ‘কই যামু আম্মা?’
আম্মা উত্তর দেয়, ‘কেন, ভোটকেন্দ্রে! জানিস না আজ আমাদের এখানে ইউনিয়ন পরিষদ উপ-নির্বাচন হচ্ছে?’ g
কার্টুন জ্যোতি
