সৈয়দ মো. রফিকুল ইসলাম
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একটা সময় ছিল যখন নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়া ছিল রীতিমতো চ্যালেঞ্জ, চাকরি করা ছিল প্রায় কল্পনাতীত, স্ত্রীদের চাকরি তো গ্রহণযোগ্যই ছিল না; কিন্তু তা এখন দূর অতীত। সমাজে পরিবর্তন এসেছে নারীরা পুরুষের মতো বাইরে সব কাজের সুযোগ পাচ্ছেন, চাকরি করছেন। কর্মজীবী নারীদের অধিকাংশই জীবিকার তাগিদে কাজ করেন। শৌখিনতার জন্য চাকরি করে এমন কর্মজীবী নারীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। উচ্চ শিক্ষিত নারীরা তাদের অর্জিত শিক্ষা, লব্ধ জ্ঞান ও মেধা কাজে লাগিয়ে লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছেন।
তবে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় এখনো কর্মজীবী নারীদের কর্মক্ষেত্রে, সমাজ-সংসারে প্রতিনিয়ত অনেক ঝুট ঝামেলা পোহাতে হয়। সমাজের অনেকে স্ত্রীদের চাকরি করা পছন্দ করে না। তাদের ধারণা, চাকরিজীবী নারীরা বাইরে মেলামেশা করে, তাদের মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন হয়, এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস জন্মায়, স্বামী-সংসারের প্রতি অমনোযোগী হয়, সামাজিকতা রক্ষা করা দুরূহ হয়, আরো কত কী! কিন্তু কর্মজীবী নারীরা, কাজের পাশাপাশি স্বামী-সংসার, নিকট পরিবার ও সমাজ সামলাচ্ছে সমান তালে। তারা পরিবারের চাহিদাগুলো পূরণেও সচেষ্ট থাকেন। তবে মাঝে মাঝে পরিবারের কারো চোখে কিছুটা কমতি পরিলক্ষিত হতেই পারে। একজন মানুষ যখন দুটি কাজে নিয়োজিত তখন কোনোটা না কোনোটায় একটু ঘাটতি থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বৃহত্ স্বার্থে স্বামী ও সংসারের অন্যদের তা মেনে নেওয়া উচিত। আমাদের সমাজে অধিকাংশ পুরুষ তাদের সংসারকে বাবা-মার সংসারের মতো দেখতে চান। স্বামী অফিস করবেন, কাজে যাবেন, টাকা উপার্জন করবেন; আর স্ত্রীরা বাসার কাজ, সন্তান পালন এবং স্বামীর সেবা করবেন। তাই এই আধুনিক সময়েও চাকরিজীবী নারীদের অনেকে স্বামী বা তার পরিবারের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে চাকরি ছেড়ে দেন। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে বর্তমান যুগে একটি পরিবারকে সত্ভাবে ও সচ্ছলতার সঙ্গে জীবন-যাপন করতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উপার্জনই সংসারে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তাছাড়া আধুনিক শিক্ষিত নারীরা সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন, তাদের অংশগ্রহণে দেশে শিক্ষিত কর্মশক্তি দ্বিগুণ হয়েছে, দেশের অর্থনীতির চাকা আরো গতিশীল হয়েছে। সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণে দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী হচ্ছে। তাই বিশ্বায়নের এই যুগে, পরিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থায় কর্মজীবী নারী কিংবা স্ত্রীদের চাকরিকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্য সমাজ-সংসারে নানা ঘটনা ঘটছে, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে তা আরো তীব্রতর হয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণ-তরুণী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, বিবাহিত-অবিবাহিত, চাকরিজীবী-গৃহিণী, সব শ্রেণির নারী-পুরুষদের মধ্যে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ হচ্ছে, অনেকে এতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে কোনো না কোনো অপরাধ সৃষ্টি হচ্ছে। আবার কর্মস্থলে বস-কলিগদের নিয়েও ঘটনা-রটনা হয়। এসব নিয়ে কখনো সংসারে অশান্তি এমনকি সংসার ভাঙার ঘটনাও ঘটে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে বছরে প্রায় ৩৪% তালাকের ঘটনা ঘটে। যার পেছনের মূল কারণ, নারী-পুরুষের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, স্বামী বা শ্বশুরালয় কর্তৃক স্ত্রীর ওপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, যৌতুক, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব, বনিবনা না হওয়া, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানো, মাদকাসক্ত, স্বামীর বেকারত্ব, স্বামী পরিত্যক্ত ইত্যাদি।
সোশ্যাল মিডিয়ার কুফল কিংবা কর্মস্থলের বৈরী পরিবেশ অথবা সামাজিক অপরাধ হতে নিজেদের রক্ষার জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই উচিত কাছাকাছি থাকা, নিজেদের মধ্যে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, একে অপরের প্রফেশনকে সম্মান করা, পছন্দের গুরুত্ব দেওয়া, কেউ কাউকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে হেয়পতিপন্ন না করা এবং নিজেদের মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা স্থাপন করা। আলাদা করে যদি বলতে হয়, তাহলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে পুরুষদের উচিত নারীদের সম্মান করা, তাদের কাজের মূল্যায়ন করা, উদার মানসিকতা নিয়ে সাংসারিক কাজে সহযোগিতা করা ও স্ত্রী-সন্তানদের একটু বেশি সময় দেওয়া এবং বাবা-মা ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে স্ত্রীর সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখা। নারীদের উচিত একটু বেশি ধৈর্যশীল ও যত্নবান হওয়া এবং সংসার ও সামাজিক বিষয়গুলো মেনে চলা। কর্মস্থলের চাপ আর সংসারের চাপে অনেকে অসহিষ্ণু আচরণ করেন। এছাড়াও বিভিন্ন কারণে ধৈর্যচ্যুত হয়ে অনেকে নিজ পরিবারের সামর্থ্য অথবা নিজ উপার্জনের ওপর অতি নির্ভরশীল হয়ে সংসার ভাঙার চরম সিদ্ধান্তও নিয়ে থাকেন। তবে বিচ্ছেদ উভয়ের জীবনেরই এক অনারোগ্য ক্ষত। দ্বিতীয় বিয়ে হলেও এর বিরূপ প্রভাব সন্তানদের ওপর পড়ে। তাই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে যে কোনো পরিস্থিতিতে সংসার টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টাটুকু করতে হয়। সংসার জীবনে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব কিংবা সাময়িক মনোমালিন্য যেন চরমপর্যায় না পৌঁছায় তা মনে রাখতে হবে, শান্তির জন্য উভয়কেই সহনশীল হতে হবে।
সময় মানুষকে উপলব্ধি করতে শেখায়। ইগো, ইমোশন, সম্মান, আত্মসম্মান এগুলো সময়ের সঙ্গে প্রশমিত হয়। সংসারের বয়সের সঙ্গে ছাড় দেওয়ার উপলব্ধিটাও স্পষ্ট হতে থাকে। সংসারে বিরাজমান সুখ-শান্তি, স্বামী-স্ত্রীর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। মনে রাখতে হবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, ‘অন্তত এক জন ছাড় দিলে সংসার স্থিতিশীল হয়, উভয়ে ছাড় দিলে সংসার সুখের হয়, কিন্তু কেউ ছাড় না দিলে বিরাজমান বিভেদ-বিবাদ একসময় বিচ্ছেদে পরিণত হয়’।
n লেখক :প্রাক্তন অধ্যক্ষ, জাহানাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ
