‘বন্যার পানিতে ১৩/১৪ দিন ধইরা ডুইবা আছি, কাম-কাজ কিছু নাই। ঘরে ২ ফুট পানি ইউঠ্যা গ্যাছে। কোন রহমে চহি উচা কইরা থ্যাকত্যাছি। এহেনে খ্যায়া না খ্যায়া দিন কাটাইত্যাছি। কেউ আঙ্গরে খবর নিবার নিগা আইসেনা। কেউ দ্যাহেনা।
বন্যা দুর্ভোগে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার যমুনার দুর্গম উমারপুর ইউনিয়নের হাপানিয়া চরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আব্দুল জব্বারের স্ত্রী মেহের উন নেছা (৬২)। নদীতে ঘর-বাড়ি বিলীন হবার কয়েক বছর আগে মিনিদিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে বাড়ি করেছে। সেই বাড়িঘরে বেশ কিছু দিন ধরে পানি উঠে পড়ায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পরিবার নিয়ে। শনিবার সকালে কোন রকমে সন্তানকে নিয়ে কাচামরিজ দিয়ে পান্তা খেয়েছেন। দুপুরে খাবেন চাল নেই। টিউবয়েল তলিয়ে যাওয়ায় দুর থেকে পানি আনতে হচ্ছে তাকে। চলাচলের জন্য ব্যবহার করছেন কলাগাছের ভেলা। এ অবস্থায় দুর্ভোগের সীমা নেই তার।
মেহের উন নেছা আক্ষেপ করে বলেন, ভোটের সময় ঠিকই মেম্বর, চেয়ারম্যান ও এমপিরা আসেন। এখন আর খোঁজ নেই। আমরা পুরো ইউনিয়ন জুড়ে বন্যায় হাবু-ডাবু খাচ্ছি কারো দেখা নেই। চেয়ারম্যানের লোকেরা তাও বলেছে কিছু সহায়তা করবে। এমন অবস্থা শৈলজানা, ধুবুলিয়া, ছলের চর, ঘোরজান, স্থলসহ আশপাশের এলাকার।
এদিকে এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা গুলো হচ্ছে যমুনা বিধৌত চৌহালী, শাহজাদপুর, বেলকুচি, সদর ও কাজিপুর উপজেলা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। বিশেষ করে চরাঞ্চল গুলোতে চলছে হাহাকার। মানুষের খাদ্য, পানি ও গবাদী পশু খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। কোন রকমে মাচা উঁচু করে করছে সবাই বসবাস। আবার বসবাসের অনুপযোগী হওয়ায় এনায়েতপুর-সিরাজগঞ্জ ওয়াপদাবাধ, পাঁচিল-প্যাচাখোলা বাধ জুড়ে অসংখ্য মানুষ গবাদি পশু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
এদিকে গত এক সপ্তাহ ধরে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীতে টানা পানি বৃদ্ধির পর সামান্য পানি কমতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে পানি ১৪ সেন্টিমিটার কমে রবিবার সকালে বিপদসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার যমুনা নদী তীরবর্তী কাজিপুর, সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলার ৪৭ হাজার পরিবারের আড়াই লাখ মানুষ বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী একএম রফিকুল ইসলাম জানান, পানি আগামী দুই, তিনদিনের মধ্যে আরো কমতে শুরু করতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে আরো জানান, ঈদের আগে যমুনা নদীর পানি তৃতীয় দফায় বৃদ্ধি পাবার আশঙ্কা রয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম জানান, যমুনার পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার ৪৭ হাজার ২১৭ পরিবারের দুই লাখ ১৩ হাজার ৪৭৩ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতি গ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ মানুষ নিজেদের উদ্যোগে পাশের উঁচু স্থান ও বাঁধে আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন।
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৪০০ টন চাল, দুই লাখ টাকার শিশু খাদ্য, দুই লাখ টাকার গো-খাদ্য ও চার হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জেলার বন্যা দুর্গত এলাকার জন্য ১৪২ টন চাল এবং দুই লাখ ৫৪ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। ১৭৯টি আশ্রয় কেন্দ্র ও ৩৩টি মেডিকল টিম প্রস্তুত রয়েছে।
ইত্তেফাক/ইউবি
