রাজিয়া সুলতানা
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির। ইটপাথরের দেয়ালঘেরা নগরজীবন এখন যান্ত্রিক সভ্যতার চার দেয়ালের মাঝে বন্দি। তাই যান্ত্রিক সভ্যতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষ এখন বেশির ভাগ সময় মোবাইল, কম্পিউটার আর টিভি দেখেই কাটাতে পছন্দ করে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যেন অনেক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। শহুরে আধুনিকতার আড়ালে প্রকৃতির সৌন্দর্য্য যেন অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে ইচ্ছা থাকলে শহরের ছোট্র পরিসরেও নিজ বাড়ির আঙিনায় প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করা যায়। গড়ে তোলা যায় শখের বাগান। উপভোগ করা যায় পাখির ডাক, সবুজ গাছ, ফুল ও ফলের ঘ্রাণ। প্রকৃতির সেই ছোঁয়ায় অল্প করে হলেও কর্মচঞ্চল নগরীর ব্যস্ত জীবন থেকে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা যায়। ক্লান্তির ছাপ দূর হয়ে অনেকটা মানসিক প্রশান্তি ফিরে পাওয়া যায়। তা সে দেশেই হোক আর বিদেশেই হোক।
মিসেস হালিমা খাতুন মুন্নী সুদীর্ঘ ১৪ বছর ধরে লন্ডনের রেডব্রিজে নিউবেরি পার্ক এলাকায় বসবাস করছেন। তিনি সুদূর লন্ডনে গিয়েও নিজের হাতে চমত্কার এক বাগান গড়ে তুলেছেন তারই নিজ বাড়ির আঙিনায়। যেখানে রয়েছে বিভিন্ন ফুল ও ফলের অপূর্ব সমারোহ। বিদেশে ব্যস্ত জীবনের মাঝে তার এই চমত্কার উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। বর্তমানে তিনি লন্ডনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টাস করেছেন। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঝিনাইদহ জেলার কোর্টচাঁদপুরে। তার গ্রামের বাড়ির আশপাশে প্রচুর জায়গা ছিল। তিনি তার মাকে ঐ সব জায়গায় বিভিন্ন সবজি ও ফুলের গাছ লাগাতে দেখতেন। মায়ের সঙ্গে তিনিও বাগানে গাছের পরিচর্যা করতেন। বলা যায়, ছোটবেলার সেই স্মৃতি তার মনের মধ্যে একটা জায়গা করে নিয়েছিল। যার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে লন্ডনের নিউবেরি পার্ক এলাকায় নিজ বাড়িতে। এত চমত্কার ও ছিমছাম বাগান দেখলে যে কারো মন ভরে যাবে। দুদণ্ড বসে দেখতে ইচ্ছে করবে।
তিনি জানান, তার বাগানটির দৈর্ঘ্য ১০০ ফুট এবং প্রস্থ ২৫ ফুট । এই বাগানে প্রায় শতাধিক ফুলের গাছ ও লতাগুল্ম আছে। বাগানে ছোটো একটি পদ্মপুকুরও আছে। ফল গাছের মধ্যে আছে চেরি, স্ট্রবেরি, ব্ল্যাকবেরি, রেড ও গ্রিন আপেল, আঙুর, পেয়ার ও প্লাস। লন্ডনে এখন গ্রীষ্মকাল চলছে। তাই বাগানে গ্রীষ্মের শাকসবজির মধ্যে আছে—লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন, মরিচ, টমেটো, শসা, লাল, পালং, পুঁইশাক, ধনেপাতা, পুদিনা পাতা, রানার বিনস, স্কোয়াস, লেবুগাছ, ক্যাপসিকাম এবং তেজপাতার গাছ। তিনি জানান, স্থানীয় গার্ডেন সেন্টার থেকে কিছু ফুল ও ফলের চারা সংগ্রহ করেন। আবার সবজির অনেক চারা তিনি ঘরেই বীজ থেকে তৈরি করেন। ঋতু পরিক্রমায় লন্ডনে শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম ও শরত্ মিলিয়ে চারটি ঋতু। তবে চারটি ঋতু থাকলেও বছরের প্রায় নয় মাসই সেখানে ঠান্ডা থাকে। শীতকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। শুধু গ্রীষ্মের তিন মাস জুন, জুলাই, আগস্ট সবজি চাষের উপযোগী থাকে।
স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে চমত্কার গোছানো সংসার হালিমার। স্বামীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। তিনিও ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে চাকরি করেন। বড় ছেলে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ছে। আর ছোটটি ও-লেভেল শেষ করে কলেজে পড়ছে। বাগান করার অনুভূতি সম্পর্কে তিনি বলেন, লন্ডনের ব্যস্ততম শহরে অফিস, বাসা, সংসার-সন্তানদের সামলানোর পরেও যখন তিনি বাগানের দিকে তাকান তখন নিজের অজান্তে মানসিক প্রশান্তিতে মন ভরে যায়। তার বাগানে বড় ফলের গাছ থাকায় প্রচুর পাখির আনাগোনা হয়। লন্ডনের কোলাহলময় শহরে পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙে। বাগানে বসার জন্য চমত্কার একটি কর্নারও আছে। আত্মীয়-পরিজনহীন লন্ডনের মতো কসমোপলিটন নগরীতে এক টুকরো বাগান সব ক্লান্তি দূর করে আনন্দের উত্স হয়ে ওঠে।
