প্রাণ সংহারী করোনা ভাইরাসের গতি-প্রকৃতি বুঝতে নিরলস চেষ্টা চালাচ্ছেন গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা। এর জিনগত বৈশিষ্ট্য উদ্ভাবনে অব্যাহত প্রচেষ্টা রয়েছে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদেরও। ১৬ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিজ্ঞানীরা ২২২টি করোনা ভাইরাসের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করেছেন। এর মধ্যে ১৭১টি করোনা ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স করেছেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) জিনোমিক রিসার্চ সেন্টারের একদল বিজ্ঞানী। এই বিজ্ঞানীরা এবার বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সবচেয়ে প্রতাপশালী ধরনটি শনাক্ত করেছেন। তারা জানালেন, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের ‘ডি৬১৪জি’ প্রোটিনটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয়, এটিই দেশে বেশি সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। গতকাল রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন বিসিএসআইআরের জিনোমিক রিসার্চ সেন্টারের গবেষকেরা।
গবেষকেরা জানান, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় করোনা ভাইরাসের ধরনটি শনাক্ত করতে পারায় এই ভাইরাসের গতি-প্রকৃতি বুঝে সংক্রমণের পরবর্তী ঢেউ রোধের প্রস্তুতি যেমন নেওয়া যাবে, তেমনি তা এখানকার জন্য টিকা তৈরির কাজটিও সহজ করবে।
বিসিএসআইআরের ডেজিগনেটেড রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস-ডিআরআইসিএম ল্যাবে সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার বিস্তারিত তুলে ধরেন জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবের প্রধান সেলিম খান। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসে ১ হাজার ২৭৪টি প্রোটিন থাকে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ইতিমধ্যে তার জিনোমিক পর্যায়ে ৫৯০টি ও প্রোটিন পর্যায়ে ২৭৩টি পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এর মধ্যে ‘ডি৬১৪জি’ নম্বর প্রোটিনটি বাংলাদেশে বেশি সক্রিয়। তিনি জানান, যেসব দেশে করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়েছে, সেসব দেশে ভাইরাসটির জিনে ৩৪৬ নম্বর থেকে ৫১২ নম্বর প্রোটিন মারাত্মকভাবে সক্রিয় ছিল, বাংলাদেশে এখনো এটি দেখা যায়নি।
২২২টি করোনা ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জিন রহস্য করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সের উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডাটা (জিআইএসএআইডি) ও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনিক্যাল ইনফরমেশনে (এনসিবিআই) প্রকাশিত হয়েছে। বিসিএসআইআর ছাড়া আরো ৯টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান করোনা ভাইরাসের জিন রহস্য উন্মোচনের গবেষণায় কাজ করছে।
সংবাদ সম্মেলনে সেলিম খান জানান, করোনা ভাইরাসে যে ১ হাজার ২৭৪টি প্রোটিন থাকে, তার মধ্যে ২১২ থেকে ৫২৩ পর্যন্ত হলো গুরুত্বপূর্ণ স্পাইক প্রোটিন। এর মধ্যে তারা কোনো মিউটেশন পাননি। ৬১৪-জি করোনা ভাইরাস যে স্ট্রেইনটি সিকোয়েন্সিংয়ে শনাক্ত হয়েছে, তা কিন্তু এর বাইরে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিটি জিনোম সিকোয়েন্সে ‘ডি৬১৪জি’ করোনা ভাইরাস স্ট্রেইনটি পেয়েছি। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস জিনোমিক ও প্রোটিন লেভেলে যে পরিবর্তন ঘটিয়েছে, এগুলোর মধ্যে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘ডি৬১৪-জি’ করোনা ভাইরাস স্ট্রেইনটি সিকোয়েন্সিংয়ে শনাক্ত হয়েছে, যাকে আমরা বাংলাদেশে সংক্রমণের প্রধান কারণ হিসেবে বলছি।’
নতুন করোনা ভাইরাসের ‘ডি৬১৪জি’ ধরনটি গত ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইউরোপে প্রথম দেখা গিয়েছিল। এখন ভারত, ব্রাজিল, ইরানেও এই ধরনটির দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখছেন বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা। ‘ডি৬১৪-জি’ ধরনটি নিয়ে চীনের গবেষকেরা বলছেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের দেহে যে এন্টিবডি তৈরি হয়, তা পরবর্তী সময়ে করোনা ভাইরাসের বিভিন্ন ধরনকে ঠেকাতে পারলেও ‘ডি৬১৪-জি’র ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান দেশে করোনা ভাইরাসের নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের ভিত্তিতে বলেন, বাংলাদেশের করোনা ভাইরাসটি ইতালির ভাইরাসটির সঙ্গে বেশি নিবিড়। তিনি বলেন, ‘কোভিড-১৯-এর জীবন রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে এর উত্স, গতি, প্রকৃতি ও বিস্তারিত সঠিকভাবে জানতে পারলে তা থেকে খুব সহজেই আমরা বেরিয়ে আসতে পারব।’
