মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ঘটছে। নরসিংদীতে দেখা দিয়েছে ব্যাপক নদীভাঙন। পদ্মার তীব্র স্রোতে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী রুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাটে সহস্রাধিক যানবাহন আটকা পড়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় এক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে, নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হয়েছেন এক ব্যবসায়ী। দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়নি, বরং অনেক এলাকায় বন্যার প্রাবল্য বেড়েছে।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুন্সীগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। পদ্মার পানি আরো বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল ভাগ্যকুলে বিপত্সীমার ৭০ ও মাওয়ায় ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং, টঙ্গিবাড়ী, শ্রীপুর ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার প্রায় ১৬ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বালিগাঁও-লৌহজং-ঢাকা সড়কের মালিরঅঙ্ক পয়েন্ট তলিয়ে গেছে। পদ্মার প্রবল স্রোতে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বহরের ১৬টি ফেরির মধ্যে গতকাল সোমবার সকাল থেকে চারটি ফেরি দিয়ে সার্ভিস সচল রাখা হয়েছে। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে শিমুলিয়া ঘাটের সব কটি ফেরিঘাটের সংযোগ সড়ক। ঘাট এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে যানজট।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী। পদ্মাসংলগ্ন উপজেলা দুটিতে এক দিকে বানের পানি, আরেক দিকে নদীভাঙনে দিশেহারা এলাকাবাসী। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে কষ্ট পাচ্ছে মানুষ। গবাদি পশু নিয়ে তারা পড়েছে বিপাকে। বন্যার পাশাপাশি নদীভাঙনও অব্যাহত রয়েছে। লৌহজং-ঢেউটিয়া ইউপির ব্রাহ্মণগাঁও, রাউত্গাঁও, পাইকারা, ভোজগাঁও, দুয়াল্লি, গাঁওপাড়া, সাইনহাটি, উত্তর দিঘলী, ঝাউটিয়া ও ধাইধা— এই ১০ গ্রাম এখন বানের পানিতে ভাসছে। নদীভাঙনের কবলে পড়েছে ব্রাহ্মণগাঁও, রাউত্গাঁও, পাইকারা, ভোজগাঁও, দুয়াল্লি, গাঁওপাড়া, সাইনহাটি ও ঝাউটিয়া গ্রাম। জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্য এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে রাজি হচ্ছে না। লৌহজং উপজেলা প্রশাসন সূত্রমতে, উপজেলায় পানিবন্দিদের জন্য চারটি আশ্রয়ণকেন্দ্র খোলা হয়েছে। পানিবন্দি ১ হাজার পরিবারে ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে।
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মানিকগঞ্জে পদ্মা ও যমুনার পানি কিছুটা কমলেও শাখা নদীগুলোর পানি বাড়ছে। এ কারণে হরিরামপুর, শিবালয় ও দৌলতপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে এক শিশু। নিখোঁজ হয়েছেন এক ব্যবসায়ী।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সালামত ফকির জানান, সোমবার দুপুরে আরিচা পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ৩ সেন্টিমিটার কমলেও এখনো বিপত্সীমার ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে তরা এলাকায় কালিগঙ্গা নদীতে ১৮ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ৭৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে চলতি মাসের ২৪ জুলাইয়ের পর পানি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় চাপ বেড়েছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায়। গত বৃহস্পতিবার থেকে ঐ রুটের যানবাহন পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবহার করছে।
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, নরসিংদীতে মেঘনা ও সুরমার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে ব্যাপক নদীভাঙন। যদিও নদীর পানি এখনো বিপত্সীমা অতিক্রম করেনি। বর্তমানে সুরমা-মেঘনা নদীর পানি নরসিংদী পয়েন্টে বিপত্সীমার ৪৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মেঘনার ভাঙনে রায়পুরা উপজেলার চাঁনপুর ইউনিয়ন এবং চরমধুয়া ইউনিয়নের কালিকাপুর ও ইমামদিরকান্দি গ্রামের বসতভিটা, গাছপালা, সদাগরকান্দি লঞ্চঘাট বাজার ছাড়াও অনেক ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
শরীয়তপুরে ৫০ গ্রামের ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি
শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, শরীয়তপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। পদ্মা নদীর পানি উপচে শরীয়তপুরের ৫০টি গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২০ হাজার পরিবার। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন তারা। বন্যার পানিতে নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার পাঁচটি পাকা রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় দুই উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেছে। সোমবার বন্যা ও ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম। তিনি নড়িয়ায় পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন।
শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, শিবচরের পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদীভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। পানিবন্দি রয়েছে হাজার হাজার পরিবার। এদিকে দুর্গত এলাকায় জেলা প্রশাসক গিয়ে আক্রান্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। এ সময় তিনি সবাইকে অভয় দিয়ে বলেন, আপনারা চিন্তা করবেন না। চিফ হুইপ, সরকার, আমরা আপনাদের পাশে আছি।
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা জানান, সোমবার পদ্মার পানি বেড়ে বিপত্সীমার ১০৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। উপজেলার দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম, উজানচর ও ছোট ভাকলা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে পাট, ধান, সবজিসহ অন্তত ১০০ হেক্টর জমির ফসল।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, মির্জাপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আমিরুল কাদের লাবন জানিয়েছেন, বংশাই ও লৌহজং নদীর পানির চাপ বেড়ে গিয়ে পৌরসভার পুষ্টকামুরী, ত্রিমোহন, গাড়াইল, কুমারজানি এলাকায় তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী দেওহাটা গরুর হাট। ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রউফ জানান, ফতেপুর, লতিফপুর, মহেড়া, জামুর্কি, বহুরিয়া, ভাওড়া, ভাদগ্রাম, ওয়ার্শি, বানাইল এবং আনাইতারা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি ডুবে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে নদীভাঙন।
গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়তে থাকায় পৌর শহরের নদ তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। পৌর শহরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শিলাসী কড়ইতলা, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ষোলহাসিয়া কড়ইতলা, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর জন্মেজয় এলাকার তিন শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, পাবনায় বড়াল নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে চাটমোহর পৌর এলাকা ও মথুরাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সহস াধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, যমুনা নদীতে পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকায় বিভিন্ন পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। এদিকে বাঁধের ওপর বসবাসকারী প্রায় সাত হাজার পরিবার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, যমুনা তীব্র স্রোতে গতকাল সকালে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের আজুগড়া স্পার-১ এর প্রায় ৭০ মিটার অংশ ধসে গেছে। তবে ধসের বিস্তৃতি ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে মেরামত কাজ শুরু করেছে।
ছাতকে আবারও বন্যা
ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়ন আবারও বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। রবিবার থেকে উপজেলার নদনদীতে পানি বাড়তে শুরু করে। সোমবার উপজেলা সদরের সঙ্গে সব ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ছাতকে গতকাল সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার ১১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে।
ইত্তেফাক/এসআই
