অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া কোনো দেশের স্বাধীনতা অর্থবহ হইতে পারে না। আর অর্থনৈতিক মুক্তির প্রথম শর্তই হইল দারিদ্র্য বিমোচন। এই দারিদ্র্য বিমোচন আমাদের সোনার বাংলার স্বপ্নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকেই আমরা এখন আগাইয়া চলিয়াছি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে দেখা যাইতেছে, ২০১৭ সালে আমাদের দেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল ২৩.১ শতাংশ, সেখানে ২০১৮ সাল শেষে তাহা কমিয়া দাঁড়াইয়াছে ২১.৮ শতাংশে। সেই হিসাবে দেশে এক বত্সরের ব্যবধানে দারিদ্র্যের হার কমিয়াছে ১.৩ শতাংশ। একইভাবে অতিদারিদ্র্যের হার কমিয়া ১১.৩ শতাংশে উপনীত হইয়াছে— যাহা গত বত্সর ছিল ১২.১ শতাংশ। আশা করা হইতেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে দারিদ্র্যের হার শূন্যে নামিয়া আসিবে। সেই দিন পূরণ হইবে আমাদের সোনার বাংলার সেই মহাস্বপ্ন।
বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়কে রহিয়াছে, দারিদ্র্যের হার প্রতি বত্সর হ্রাস পাওয়াটা তাহার অন্যতম প্রমাণ। এমনকি বর্তমানে আমাদের অতিদারিদ্র্যের যে হার রহিয়াছে, তাহা বিশ্ব গড় দারিদ্র্য হারের নিচে অবস্থান করিতেছে। এইসব তথ্য আমাদের আশান্বিত করে এবং উন্নত দেশে পরিণত হইবার স্বপ্নকে আরো বড় করিয়া তোলে বৈকি। ইহার আগে বিবিএস ২০১০ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ করিয়া দেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার নির্ধারণ করিয়াছিল সাড়ে ৩১ শতাংশ। সেখান হইতে গত এক দশকে আমাদের অভূতপূর্ব উন্নতি হইয়াছে। ইহার কারণ, এই সময়ে আমাদের ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হইয়াছে। বর্তমানে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাতের উপরে। দেশে চলমান বড় বড় প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হইলে শীঘ্রই ইহা দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাইয়া যাইবে বলিয়া আশা করা হইতেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ দেশের মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করিতেছে। তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করিতেছে। বিশ্বপরিসরে আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশ ভালো করিতেছে। অন্যদিকে নানা সংকট থাকা সত্ত্বেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়িয়াছে। সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম গতিলাভ করিয়াছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে করা হইযাছে কর্মসংস্থান ও বাজারমুখী। ফলে সব মিলাইয়া দারিদ্র্য হ্রাস পাইতেছে দিন দিন।
অবশ্য দারিদ্র্যের হার কমিলেও আমাদের এখনো কতগুলি চ্যালেঞ্জ রহিয়া গিয়াছে। সমপ্রতি বিশ্বব্যাংক জানাইয়াছে, আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় শহরে অতি দরিদ্রের হার বাড়িতেছে। ২০১০ সালে যেখানে ইহা ছিল ৩০ লক্ষ, সেখানে তাহা ৩৩ লক্ষে পরিণত হইয়াছে। অন্যদিকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের তুলনায় দারিদ্র্যের ধরনও পরিবর্তিত হইয়াছে। দিনাজপুর, বরগুনা, সাতক্ষীরা, মাগুরা, রংপুর, রাজশাহী ও খুলনাসহ কোথাও কোথাও দারিদ্র্যের নূতন পকেট সৃষ্টি হইয়াছে। এখন এইসব দিকে আমাদের মনোযোগী হইতে হইবে। ইহার পাশাপাশি কর্মযোগ্য মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি, মুদ্রাব্যবস্থা সংযতভাবে পরিচালনা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা বিধান ও খেলাপি ঋণ হ্রাস, উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলককরণ, টেকসই কৃষি উন্নয়ন, জমির পুনর্বণ্টন, খাসজমি বরাদ্দে পরিবর্তন আনয়ন, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের পরিধি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে গুণগত মান বৃদ্ধি ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করিতে পারি।
