কোরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। আল্লাহর সঙ্গে বান্দার ভালোবাসার অনন্য প্রতীক হচ্ছে এই কোরবানি। কোরবানির মাধ্যমেই আল্লাহর নির্দেশ পালন ও ভালোবাসার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন আল্লাহর খলিল হজরত ইবরাহিম (আ)। কোরবানি সম্পর্কে আমাদের প্রাণপ্রিয় নবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, ‘কোরবানির দিনে পশু কোরবানির চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রিয় আর কোনো আমল নেই।’ হাদিসটি তিরমিযি ও ইবন মাযাহ শরিফে বর্ণিত হয়েছে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করবে না, তার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। নবি করিম (স) বলেন, ‘যার কোরবানি করার সামর্থ্য আছে, সে যদি কোরবানি না করে, তাহলে সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ হাদিসটি আহমাদ শরিফে বর্ণিত হয়েছে।
কোরবানি প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব। প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যিনি ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবেন, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রুপা, অলংকার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসে না এমন জমি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যাবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। নেসাব বলতে বোঝায় স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত তোলা, রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন তোলা, নগদ অর্থ ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর স্বর্ণ-রুপা কিংবা নগদ অর্থ—এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে, তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়, তাহলেও তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। কোরবানির ক্ষেত্রে যাকাতের মতো নেসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়, কেবল ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কারো কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত এ সম্পদ থাকলেই তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
নাবালেগ শিশু-কিশোর এবং যে ব্যক্তি সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। তবে তার অভিভাবক যদি নিজ সম্পদ থেকে তাদের পক্ষে কোরবানি করেন, তা সহিহ্ হবে এবং তারা সেই সাওয়াবের অধিকারী হবে। যে ব্যক্তি কোরবানির দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে, অর্থাত্ ৭৮ কিলোমিটারের বেশি পথ দূরে কোথাও সফর করেছেন, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। তবে কোরবানির তিন দিনের যে কোনো এক দিন নিজ বাড়িতে ফিরে এলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
দরিদ্র ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়; তবে সে যদি কোরবানির নিয়তে পশু খরিদ করে, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। কোনো যৌথ পরিবারে যদি একাধিক প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য থাকেন আর ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাদের প্রত্যেকের কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে সবার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। শুধু পরিবারের কর্তাব্যক্তির নামে কোরবানি করলে অন্যদের কোরবানি আদায় হবে না। মোটকথা হচ্ছে, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন ও পরিবারের যে কোনো সদস্য নেসাবের সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা—এগুলো কোরবানি করা যায়েজ। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন—হরিণ, বন্য গরু ইত্যাদি দ্বারা কোরবানি যায়েজ নয়। কোরবানির পশুর বয়সসীমা হচ্ছে—উট কমপক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে, গরু-মহিষ দুই বছর আর ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এক বছর। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি এক বছরের কমও হয় এবং তা এমন হূষ্টপুষ্ট দেখায় যে দেখতে এক বছরের মতো মনে হয়, তাহলে এর দ্বারা কোরবানি যায়েজ হবে। কিন্তু ছাগলের বয়স এক বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই কোরবানি সহিহ হবে না। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কোরবানি দিতে পারবেন। গরু, মহিষ, উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত শরিক মিলে কোরবানি দেওয়া যাবে। জোড়-বিজোড় যে কোনো সংখ্যাই হোক, কোরবানি সহিহ্ হবে। যত জন মিলে কোরবানি করবেন, তাদের ভাগ অনুযায়ী টাকা দিয়ে শরিক হতে হবে। জবাই, ছোলাকাটার টাকাও ভাগ অনুযায়ী দিতে হবে।
কোরবানির নিয়ত সহিহ্ হতে হবে এবং তা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশেই হতে হবে। শরিকদের কারো নিয়ত যদি গোশত খাওয়া কিংবা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে কারো কোরবানিই আদায় হবে না। অতএব, খুব সাবধানতার সঙ্গে শরিক নির্বাচন করতে হবে। গরু, মহিষ ও উটে আকিকার নিয়তে শরিক হওয়া যাবে। এতে যিনি কোরবানির নিয়ত করবেন, তার কোরবানি আদায় হবে এবং যিনি আকিকার নিয়ত করবেন, তার আকিকাও আদায় হবে। যদি কেউ গরু, মহিষ ও উট একা কোরবানি দেওয়ার নিয়তে খরিদ করেন আর তিনি যদি ধনী হন, তাহলে ইচ্ছা করলে অন্যকেও শরিক নিতে পারবেন। শরিক করলে সেই টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। তবে সেই ব্যক্তি যদি গরিব হন, তাহলে অন্যকে শরিক নিতে পারবেন না।
অন্যের ওয়াজিব কোরবানি দিতে চাইলে তার অনুমতি নিতে হবে, নতুবা ঐ ব্যক্তির কোরবানি আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষে কোরবানি করেন, তাহলে তাদের কোরবানি আদায় হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো। কয়েক জন মিলে কোরবানি করার ক্ষেত্রে কোরবানির আগে যদি কোনো শরিক মারা যান, তাহলে তার ওয়ারিশানদের অনুমতি নিতে হবে। তারা অনুমতি দিলে কোরবানি করা যাবে। নচেত ঐ শরিকের টাকা ফেরত দিতে হবে। তবে তার স্থলে অন্য শরিক নেওয়া যাবে। কয়েক শরিক মিলে কোরবানি করলে ওজন করে গোশত ভাগ করে নিতে হবে। কোরবানির গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা যায়েজ নেই। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সাদকা করতে হবে। চামড়া বিক্রি করা যাবে; তবে তার মূল্য গরিবদের সাদকা করে দিতে হবে। জবাইকারী, সহযোগিতাকারী, কসাই ও ছোলা-কাটার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের পারিশ্রমিক চামড়ার টাকা থেকে দেওয়া কিংবা গোশত দিয়ে দেওয়া যায়েজ নেই। তাদের পারিশ্রমিক আলাদা করে দিয়ে প্রতিবেশী বা হকদার হিসেবে কিছু গোশত দেওয়া যায়েজ আছে। কোরবানির গোশতের এক-তৃতীয়াংশ নিজের জন্য রাখা, এক-তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকীন প্রতিবেশীকে দেওয়া এবং এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়স্বজনকে দেওয়া উত্তম।
প্রাণঘাতী বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাব ও বন্যার মধ্যেই আমাদের মাঝে এবার আসছে পবিত্র কোরবানি। সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য কোরবানি যেমন একটা পরীক্ষা, তেমনি আমাদের চারপাশে বিত্তহীন দুস্থ মানুষের জন্য কিছু করতে পারাও আমাদের ইমানি দায়িত্ব। আসুন, প্রত্যেকে প্রত্যেকের দায়িত্ব মনে করে আমরা তাদের মধ্যে আমাদের কোরবানির গোশত বণ্টন করি। আল্লাহ আমাদের কোরবানির মাধ্যমে তার নৈকট্য অর্জনের তওফিক দান করুন। আমিন!
l লেখক :ইসলামি গবেষক ও বাংলাদেশ বেতারের ধর্মীয় উপস্থাপক
