কোভিড-১৯ বা করোনা মহামারিতে বিশ্ব জুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি আর এ ব্যাধির সুবাদে ধরার মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হয়েছে ৬ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি লোককে। অবশ্য মোট মৃতের সংখ্যা বিবেচনায় আরেক মহামারি বিউবোনিক প্লেগ-এর সঙ্গে এখন পর্যন্ত তুলনার যোগ্যই হয়নি করোনা। ‘ব্ল্যাক ডেথ’ খ্যাত প্লেগ বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারি। মতভেদে সাড়ে ৭ কোটি থেকে ২০ কোটি লোক মারা গিয়েছিল পেস্টিলেন্স হিসেবেও পরিচিত এ রোগে। মূল সময়টা ছিল ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ আর কেন্দ্রস্থল ইউরেশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা। এ ধরনের প্রাদুর্ভাবের কারণে মানব ইতিহাসের প্রায় পুরোটা জুড়ে ধরিত্রীর লোকসংখ্যা গড়ে এতটাই ধীরগতিতে বেড়েছে যে, জনবিশারদদের কেউ কেউ এমন কথাও বলেন, বেশির ভাগ জিয়ন্ত থাকলেও বসুন্ধরার খুব একটা সমস্যাতো হতোই না, ১ থেকে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ, এ সময়টায় আদমসন্তানের সংখ্যা ২০ কোটি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৬০ কোটি। ইংরেজি ১৮০০ সাল নাগাদ টেনেটুনে ছোঁয়া গিয়েছিল ১০০ কোটির মাইলফলক। এরপরই ধরায় ঘটে জনস্ফীতি। প্রথমে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে; পরবর্তীতে বাকি ইউরোপের অধিকাংশে এবং ঘটনাক্রমে এশিয়ায়। ১৯২০ সালের শেষদিকে এসে জনসংখ্যা দাঁড়ায় ২০০ কোটি। মোট সংখ্যাটা ৪০০ কোটি অতিক্রম করে ১৯৭৫ সালে। তার পর থেকে আজ অব্দি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। পৃথিবী নামক একমাত্র বসবাসযোগ্য গ্রহের অধিবাসী এখন ৭৬০ কোটি।
প্রথমত পশ্চিমের অর্থনৈতিক উত্থানে ভূমিকা রেখেছে জনসংখ্যা আর এখন বাকি বিশ্বে অবদান রাখলেও তা অপ্রশংসিত। উদাহারণস্বরূপ, প্রথমে বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরা যাক। ১৮৫০ সালে ২ কোটি ৩০ লাখ লোকের বাস ছিল দেশটিতে, যা কি না তখনকার ফ্রান্সের চেয়ে ১ কোটি ৩০ লাখ কম। এখন যুক্তরাষ্ট্রের লোকসংখ্যা ৩৩ কোটির কাছাকাছি। ব্রিটিশ, ডাচ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ও ইতালিয়ান জনসংখ্যা মিলেও এর সমান নয়। শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তাদের রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহত্ দক্ষ শ্রমশক্তি। বিভিন্ন পরিমাপেও, যেমন অ্যাডাল্ট স্কুলিংয়ের মধ্যক বছরেও তারা এগিয়ে।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে চীন বাধ্যবাধকতা আরোপ করা সত্ত্বেও আসল মহাশক্তি প্রতিযোগীদের একটি হয়ে গত কয়েক দশক ধরে টিকে থাকার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কি তারা তাদের বিশাল শ্রমশক্তিকে এড়িয়ে যেতে পারবে? ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নানাবিধ উপায়ে হেলাফেলা করে তার জনসংখ্যাগত তীক্ষতা ক্ষয় বা নষ্ট করে ফেলেছে। এমনকি ইউরোপ ও এশিয়ায় তাদের ঐকিহ্যবাহী মিত্রগুলোও জনসংখ্যার স্থবিরতা বা হ্রাস নিয়ে রীতিমতো সংগ্রাম করছে। তার ওপর এবার যুক্ত হয়েছে করোনার মৃত্যুর মিছিল। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির ক্ষতি এখন পর্যন্ত সীমিত থাকার যে কারণটি চিহ্নিত, সেটি হচ্ছে প্রধান ভূরাজনৈতিক শত্রুরা তাদের চেয়ে আরো বেশি মারাত্মক জনসংখ্যা সমস্যা মোকাবিলা করছে। অতীতকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের কথা ভাবলে বলতেই হয়, জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাস্তরের উন্নয়ন ঘটিয়ে নতুন কোনো দেশ মহাশক্তির সম্মান অর্জন করে নিলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
—ব্লুমবার্গ অনুসরণে
