নির্বাচন পদ্ধতিতে তথ্যপ্রযুক্তি অন্তর্ভুক্তকরণের লক্ষ্যে ব্যবহার হবে

ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২০:৪৩

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের অংশ হিসেবে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দিনব্যাপী ইভিএম প্রদর্শনীর আয়োজনও করেছে। প্রদর্শনীতে উত্সুক জনতার উপস্থিতিও ছিল নজরে আসার মতো। আমাদের এবারের আয়োজন ইভিএম-এর মাধ্যমে ভোট প্রয়োগ পদ্ধতিসহ নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। বিস্তারিত লিখেছেন মাহবুব শরীফ

ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)

ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন এর সংক্ষিপ্ত নামই ‘ইভিএম’। সনাতনী ব্যালট ব্যাংক এবং কাগজে ছাপা প্রতীকের ব্যালট পেপারের বদলে মেশিনে থাকা পছন্দের প্রতীকের পাশে থাকা বাটন চেপে ভোট দেয়া যায়। একটি মেশিনে সর্বোচ্চ ৬৪ জন প্রার্থীর তালিকা রাখা যাবে এবং প্রায় ৪ হাজার ভোট গ্রহণ করা সম্ভব। একটি ভোট দিতে ১৫ সেকেন্ড সময় লাগে। মেশিনটিতে একটি পূর্ব-প্রোগ্রামিং করা মাইক্রোচিপ থাকে যা প্রতিটি ভোটের ফলাফল তাত্ক্ষণিকভাবে হিসেব করে প্রদর্শন করে।

যেভাবে কাজ করে ইভিএম

ভোটের দিন ভোটকক্ষে নিয়োজিত প্রিজাইডিং অফিসার কেন্দ্রের সব ভোটকক্ষে সেট করা ভোটিং মেশিন চালু করার নিরাপত্তা পিন কোড এবং পাসওয়ার্ড গোপনীয়ভাবে রিটার্নিং অফিসারের দপ্তর থেকে গ্রহণ, সংরক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সহকারি প্রিজাইডিং অফিসারকে সরবরাহ করবেন। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে থাকে ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিট। এই ইউনিটের সম্মুখভাগে থাকে ডিজিটাল ডিসপ্লে। বিপরীত দিকে থাকে স্টার্ট সুইচ, ব্যালট নামক সুইচ, মেমোরি রিসেট সুইচ, ফাইনাল রেজাল্ট সুইচ এবং ক্লোজ বাটনসহ আরো কিছু সুইচ।

সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার অডিট কার্ড স্লটে প্রয়োজনে স্মার্টকার্ড প্রবেশ করিয়ে ভোটার সনাক্ত করবেন। একজন পোলিং অফিসার ভোটার তালিকার হার্ডকপির (কাগজে ছাপা তালিকা) সাথে মিলিয়ে সনাক্তকৃত ভোটার নম্বর চিহ্নিত করবেন এবং অপর পোলিং অফিসার বৈধ ভোটারের আঙুলে অমোচনীয় কালির দাগ দিবেন। এরপর সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার ভোটারকে ইলেক্ট্রনিক ব্যালট ইস্যু করবেন।

তারপর ব্যালট সুইচটি চেপে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ভোটারকে ভোট দিতে বুথে পাঠান। এই সুইচটি চাপলে বুথের মধ্যে থাকা ইভিএমের অপর অংশ ব্যালট ইউনিটটি একটি ভোট দেয়ার জন্য কার্যকর হয়। ভোট দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার অকার্যকর হয়ে যায় ব্যালট ইউনিটটি। তারপর আবার কন্ট্রোল ইউনিটের ব্যালট সুইচ চেপে কার্যকর করতে হবে। এভাবে ভোট গ্রহন সম্পন্ন হলে কনফর্ম সুইচটি চাপলেই ভোটগ্রহণ কার্যক্রম পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যাবে এবং সর্বশেষে কনফর্ম সুইজে চাপ দিলে তা কার্যকর হবে।

ইভিএম-এ ভোটদান পদ্ধতি

সম্প্রতি (১২ নভেম্বর) রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হলো দিনব্যাপী ইভিএম প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে অনেকগুলো বুথে ইলেক্ট্রনিক ভোর্টি মেশিন প্রদর্শন করা হয়ে। সাথে সাথে উপস্থিত আগ্রহী নাগরীকদেরকে বুঝিয়ে দেয়া হয় ভোটদান পদ্ধতি।

প্রত্যেকটি বুথের প্রিজাইডিং অফিসারের নিকট একটি করে ভোটার সনাক্ত করণ ডিভাইস বা মেশিন থাকবে। এই ডিভাইস বা মেশিনের মাধ্যমে ভোটারদের স্মার্টকার্ড সংযোগ করে অথবা তার আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে নিশ্চিত করা হবে যে সে আসলেই এই কেন্দ্রের ভোটার কি না? যদি সে ভোটার হয়ে থাকে বা তার তথ্য সনাক্তকরণ ডিভাইসে প্রদর্শিত হয় তাহলে প্রিজাইডিং অফিসার ভোট প্রদানের জন্য বুথের ভিতরে প্রবেশ করতে বলবে। বুথের মধ্যে থাকবে আরো একটি ডিভাইস। যেটি দিয়ে ভোটাররা বাটন টিপে ভোট দিবে। এই ডিভাইসটিতে সর্বমোট ১২টি বাটন রয়েছে। প্রথম ১০টি বাটনের বাম দিকে প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক থাকবে। ভোটার ওই প্রতীক দেখে প্রতীকের ডান দিকের বাটনে চাপ দিয়ে নিচে থাকা সবুজ রঙ্গের কনফর্ম বাটন চাপ দিবে।

কোনো ক্ষেত্রে প্রার্থী যদি প্রতীক বাটন চাপতে ভুল করে বা তার কাঙ্খিত বাটনে চাপ না দিয়ে অন্য বাটনে চাপ দিয়ে থাকে তাহলে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে কাঙ্খিত বাটনে চাপ দিতে হবে। যদি ১০ সেকেন্ডের মধ্যে এই কাজটি না করা হয় তাহলে অটোমেটিক প্রথম যে বাটনে চাপ দিয়েছে ওই প্রতীকে ভোট চিহ্নিত হবে। এভাবে পর পর তিন বার ভুল সংশোধনের সুযোগ পাবেন ভোটাররা।

 

ভোটার শনাক্ত হবে যেভাবে

প্রত্যেক প্রিজাইডিং অফিসারকে একটি করে অডিট কার্ড দেয়া হবে। এই কার্ডের মধ্যে থাকবে নির্ধারিত ভোট কেন্দ্রের ভোটারদের যাবতীয় তথ্য। একজন ভোটার যখন ভোট দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে আসবে তথ্য প্রিজাইডিং অফিসার অডিট কার্ডে থাকা তথ্যের মাধ্যমে ভোটার সনাক্ত করবেন। এজন্য ভোটারের ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়া দিতে হবে সনাক্তকরণ মেশিনে। পরবর্তীতে চলে আসবে ভোটারের যাবতীয় তথ্য।

ভোট সংগ্রহ পদ্ধতি

ভোটার যখন বাটন টিপে ভোট দিবেন তখন সেই ভোটটি এসে জমা হবে প্রিজাইডিং অফিসারের ভোটার সনাক্তকরণ মোশিনে থাকা অপর একটি চিপসে। এটিও দেখতে অডিট কার্ডের মতোই। একটি ভোট কেন্দ্রে যতগুলো ইভিএম মেশিন থাকবে সবগুলোর তথ্য এনে একটি মাস্টার মেশিনে জমা করা হবে তথ্য সংরহকরণ চিপসের মাধ্যমে। ভোট কেন্দ্রের বাইরেও থাকবে বড় আকারের ডিজিটাল ডিসপ্লে। এখানে আগ্রহীরা বাইরে বসেই দেখতে পাবেন কত জন ভোট দিয়েছেন। 

আরও যেসব দেশে ইভিএম

আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের বেশিরভাগ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। এ নিয়ে সেখানেও রয়েছে অনেক বিতর্ক। ভারত ছাড়াও ব্রাজিলে ইভিএম চালু আছে। ইউরোপের এস্তোনিয়া এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও ইভিএম চালু আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যেও ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতির ভোটিং চালু রয়েছে।

ইভিএমের সুফল

একটি ইভিএম দিয়ে ৫টি জাতীয় নির্বাচন করা সম্ভব। তবে আধুনিক এই মেশিনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন বা উপ নির্বাচনেও ভোট গ্রহণ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে শুধু মেশিনটিতে নতুন করে প্রোগ্রাম প্রবেশ করাতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ভোটারের ভোট বাতিল হবে না। ভোটের তথ্য মেশিনে প্রায় ১০ বছর ধরে অবিকৃত অবস্থায় থাকবে। একজন ভোটার ভোট দেয়ার পর ১০ থেকে ১২ সেকেন্ড ব্যালট ইউনিট স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর থাকে। ফলে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ইচ্ছা করলেও একজন ভোটারকে একাধিক ভোট দানের সুযোগ করে দিতে পারবেন না। কোন কেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটলে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার কন্ট্রোল ইউনিটের ক্লোজ সুইচটি চেপে দিলেই দখলকারীরা কোনো ভোট দিতে পারবে না। তাছাড়া ইভিএমের স্মার্ট কার্ড সরিয়ে ফেললেও মেশিনটি চালু করা যাবে না। আবার প্রতি মিনিটে ৫টির বেশি ভোট দেয়া যাবে না।

বাংলাদেশে ইভিএম এর শুরু

২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন নির্বাচনে নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে ব্যবহারের মাধ্যমে এই ইভিএম নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়। সর্বশেষ বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহার করেছে নির্বাচন কমিশন।

‘নির্বাচনে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও নিরাপদে ভোট গ্রহণের জন্য ইভিএম’

নির্বাচন ব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যে ইকেট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। বর্তমানে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন প্রকল্পের অফিসার ইনচার্জ, অপারেশন প্লানিং অ্যান্ড কমিউনিকেশনের দায়ীত্ব পালন করছেন এসএম মাহমুদ আরাফাত। সম্প্রতি (১২ নভেম্বর) রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দিনব্যাপী ইভিএম প্রদর্শনী হয়েছে। এবিষয়য়ে মাহমুদ আরাফাত বলেন,‘ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রদর্শনীতে অনেক লোকের উপস্থিতি ছিল। প্রদর্শনীতে অনেকগুলো বুথ সাজানো ছিল। এখানে উত্সুক জনতা এসে ইভিএম সম্পর্কে, ভোটদান পদ্ধতি, ভোট গ্রহণ পদ্ধতি সম্পর্কে জেনেছে। এখানে এমনভাবে বুথগুলো সাজানো হয়েছে দেখে মনে হয়েছে এক একটি ভোট কেন্দ্র।’ তিনি আরো জানান, ইভিএম একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভোটদান পদ্ধতি। জনসচেতনা বৃদ্ধি ও তাদের উত্সাহিত করার উদ্দেশ্যেই মূলত ইভিএম প্রদর্শনী করা হয়েছে। এখানে এসে সবাই তাদের যাবতীয় প্রশ্ন বুথে দায়ীত্বরত কর্মীদের কাছ থেকে জানতে পেরেছে। এটি একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভোটিং পদ্ধতি তাই জনগণের জন্য প্রদর্শনীতে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে এর যাবতীয় নিয়ে। বিভিন্ন বুথ ঘুরে বুথে কর্মরত কয়েকজন জানান, ইভিএম ভোটিং মেশিন একটি আধুনিক প্রক্রিয়ার ভোটিং পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ভোট প্রদানে বা গ্রহনে কোনো প্রকার অনিয়ম হওয়ার সম্ভবনা নেই। কেন্দ্রের বাইরে বসেও উত্সুক ভোটাররা দেখতে পাবেন কী পরিমাণে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। এই মেশিনগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগ থাকে না এবং এক কেন্দ্রের মেশিনের মধ্যে অন্য ভোট কেন্দ্রের ভোটারদের তথ্যও থাকে না।