প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ইইউ’র সঙ্গে
যে বিচ্ছেদ চুক্তি সম্পাদন করেছেন, সেটিকে দেশের স্বার্থবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন অনেক ব্রিটিশ এমপি। ব্রেক্সিট ইস্যুতে পদত্যাগ করা মন্ত্রী বোরিস জনসন এবং জ্যাকব
রিস-মগ ইতোমধ্যেই খসড়া চুক্তির সমালোচনা করে বলেছেন, খসড়া মানলে যুক্তরাজ্য ইইউ’র নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বিরোধীরা চুক্তির খসড়া প্রত্যাখ্যান করতে সবার প্রতি
আহ্বান জানিয়েছেন
শিরিন আক্তার
হার্ড ব্রেক্সিট, সফট ব্রেক্সিট, নরওয়ে প্লাস, কানাডা প্লাস প্লাস। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটেনে এগুলোর সবকয়টি নিয়েই আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখনো সফলতা আসেনি। এখন নো ডিল ব্রেক্সিট (চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট) করার দিকেই জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে নরওয়ে মডেলকেই অনুসরণ করা হচ্ছে। নরওয়ে প্লাস নয়। কিন্তু নরওয়ে আর ব্রিটেন যে এক নয় তা নিয়েও চলছে জোর আলোচনা। এমনকি নরওয়েও ব্রিটেনের কাছে এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে।
‘নো ডিল’ ব্রেক্সিট
কৌশলগত দিক থেকে চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিটের অর্থ হচ্ছে-২০১৯ সালের ২৯ মার্চ কোনো চুক্তি ছাড়াই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে যাবে। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড সীমান্ত নিয়ে এখনই ইইউ’র সঙ্গে চুক্তি হবে না। ব্রেক্সিট ইস্যুতে গণভোটের আগে ব্রিটেন ইইউকে যে অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল সেই বিষয়ে এবং নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কোনো চুক্তি হবে না। হার্ড লাইন ব্রেক্সিটের পক্ষের মানুষরা চুক্তি ছাড়া বিচ্ছেদকে সমর্থন করছেন। তারা মনে করছেন, ইইউ’র সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে যে সমঝোতা করেছেন তা অনুসরণ করলে ইইউ ত্যাগ করলেও ব্রিটেন ইইউ’র দাস হয়ে থাকবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়নমন্ত্রী পেনি মরদৌয়ান্ত চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিটের প্রস্তাব করেন।
নরওয়ে মডেল
ব্রেক্সিট পরিকল্পনায় দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে নরওয়ে মডেলকে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য না হয়েও নরওয়ে এই আঞ্চলিক জোটের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। লিসটেনস্টাইন এবং আইসল্যান্ডের মতো ইউরোপিয়ান ইকোনোমিক এরিয়া (ইইএ) এবং ইউরোপিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া এসোসিয়েশনের (ইএফটিএ) সদস্য। এর ফলে ইইউ’র সিঙ্গেল মার্কেটে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে নরওয়ে। ইইউ’র সঙ্গে বাণিজ্যে নরওয়ের খুব একটা ঝামেলা পোহাতে হয় না। বিনিময়ে নরওয়ে ইইউ’র বাজেটে সামান্য অবদান রাখে এবং দেশটিকে ইইউ’র অনেক আইন ও নীতিকে অনুসরণ করতে হয়। নরওয়ে মডেল আপাতত ব্রিটেনের জন্য সমাধান দিতে পারে এবং দেশের অচলাবস্থা দূর করতে পারে। যদিও ব্রিটেন ইইউ’র কাছে অঙ্গীকার করেছে, তারা নরওয়ের চেয়ে আইন-কানুন অনেক বেশি মেনে চলবে।
ব্রিটেনের জন্য যেভাবে দরকার
নরওয়ের মাছ শিকার এবং কৃষি খাত অনেক বড়। দেশটিকে ইইউ’র মাছ শিকার এবং কৃষি নীতি মেনে চলতে হয় না। তারা নিজেরাই আইন তৈরি করতে পারে। ব্রিটেনেরও এই খাতগুলো বড়। তারাও একইভাবে ইইউ’র সঙ্গে এগুলো নিয়ে সমঝোতা করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ খাতে তারা নিজেদের আইনই ব্যবহার করতে পারে। ইইউ’র বাইরের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নরওয়ে স্বাধীনভাবে বাণিজ্য নিয়ে সমঝোতা বা চুক্তি করতে পারে। ব্রিটেনও ইএফটিএভুক্ত দেশ এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিজস্ব পদ্ধতি অনুযায়ী বাণিজ্য নীতি চালাতে পারবে। অর্থাত্ ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিস কর্তৃক পরিচালিত হবে না ব্রিটেন।
ইইউ’র সিঙ্গেল মার্কেটে (একক বাজার) প্রবেশাধিকারের জন্য নরওয়ে চারটি স্বাধীনতা ভোগ করে। পণ্য, সেবা, মূলধন এবং মানুষের চলাচলে স্বাধীনতা। ব্রিটেনও এই ধরনের নীতি মেনে চলতে পারে। কিন্তু সেটা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ইতোমধ্যেই ইইউ’র সিঙ্গেল মার্কেট এবং কাস্টমস ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার অঙ্গীকার করেছেন। নরওয়ে কাস্টমস ইউনিয়নের সদস্য নয়। তাই ব্রিটেনকে নরওয়ে প্লাসের দিকেও নজর দেওয়া লাগতে পারে। অর্থাত্ কাস্টমস ইউনিয়নের সঙ্গে কীভাবে সমঝোতা করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
যেভাবে এগুচ্ছে ইইউ ও যুক্তরাজ্য
আগামী ১৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট নিয়ে ভোট হওয়ার কথা। কিন্তু এই প্রস্তাব পাস হবে না বলেই সবাই ধরে নিচ্ছেন। ফলে ইইউ এবং ব্রিটেন উভয়েই চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিটের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত বুধবার ইইউ কমিশন পারস্পরিক পণ্য ও সেবার পরিবহন এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সচল রাখাসহ ১৪টি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ঘোষণা করে। এর আগের দিন মঙ্গলবার ব্রিটিশ মন্ত্রিসভাও চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিটের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানায়। ইইউ’র চিন্তা, চুক্তি ছাড়া ব্রিটেন বেরিয়ে গেলে হঠাত্ করে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কা আছে। বর্তমান পদক্ষেপে সেই ক্ষতি পুরোটা কমানো সম্ভব না হলেও কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে বলে মনে করছে ইইউ। জোটের পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে— পরিবহন, শুল্ক ব্যবস্থাপনা (কাস্টমস), তথ্য সুরক্ষা, প্রাণী স্বাস্থ্য, জলবায়ু সংক্রান্ত নীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সেবাসহ মোট ৮টি খাত। প্রায় সব খাতে বর্তমান নীতি বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট হলে মৌলিক যাতায়াত বজায় রাখার স্বার্থে ১২ মাস পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ অব্যাহত এবং ব্রিটিশ বিমান ইইউ’র আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে। সড়কপথে পণ্যের পরিবহন অব্যাহত থাকবে ৯ মাস পর্যন্ত। ব্রিটেনের আর্থিক সেবা খাতের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুই বছর পর্যন্ত ইইউ’র সমকক্ষ বলে বিবেচনা করা হবে। এছাড়া যুক্তরাজ্য ইইউ নাগরিকদের যেভাবে বিবেচনা করবে ঠিক সেভাবেই ব্রিটিশ নাগরিকদের বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইইউ। আর ব্রিটিশরা ৯০ দিনের জন্য ইইউভুক্ত দেশে ভিসা ছাড়াই যাতায়াত করতে পারবেন।
ইইউ বলছে, এসব ঘোষণা চুক্তি নয়। এসবের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্য সদস্য হিসেবেও বিবেচিত হবে না। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই ইইউ যেকোনো সময় এসব সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য সরকার চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সরকারি দপ্তরগুলোকে অতিরিক্ত দুই বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দিয়েছে। সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো সচল রাখতে সাড়ে তিন হাজার সেনা প্রস্তুত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এছাড়া চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিটের প্রস্তুতি নিতে ১ লাখ ৪০ হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকার চিঠি দিয়েছে। এর আগে ব্রিটিশ সরকার প্রতিটি খাতে চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের প্রভাব উল্লেখ করে আলাদা আলাদা নির্দেশিকা প্রকাশ করেছিল।
প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ইইউ’র সঙ্গে যে বিচ্ছেদ চুক্তি সম্পাদন করেছেন, সেটিকে দেশের স্বার্থবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন অনেক ব্রিটিশ এমপি। ব্রেক্সিট ইস্যুতে পদত্যাগ করা মন্ত্রী বোরিস জনসন এবং জ্যাকব রিস-মগ ইতোমধ্যেই খসড়া চুক্তির সমালোচনা করে বলেছেন, খসড়া মানলে যুক্তরাজ্য ইইউ’র নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বিরোধীরা চুক্তির খসড়া প্রত্যাখ্যান করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। খসড়া চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। তবে ৫শ’র অধিক পৃষ্ঠার এই দলিলে মোটাদাগে ভবিষ্যতে ইইউ’র সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের ধরন কেমন হবে সেই বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। একইসঙ্গে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে সীমান্তে কোনো রকম তল্লাশি চালানো হবে না এমন নিশ্চয়তার বিধান রাখা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, ইইউ’র বাণিজ্য বিষয়ক নিয়মনীতির ফলে যুক্তরাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চুক্তিতে ব্রেক্সিটের পর ২৯ মার্চ যুক্তরাজ্য যখন বেরিয়ে যাবে, তখন দেশটির নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে বিভিন্ন অঙ্গীকার এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
