মো. সাব্বির আহমেদ
ইদানীং বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলাম, আসলে সমালোচনা কী? সমালোচনা কেনই-বা করা হয়? সমালোচনা ভালো নাকি মন্দ? সমালোচনা আবার বিদ্বেষ নয় তো? এসব ভাবতে গিয়ে বুঝলাম, সমালোচনা খারাপ বা মন্দ কোনো বিষয় নয়, তবে সেটা হতে হবে গঠনমূলক। গঠনমূলক সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা একজন ব্যক্তি ও একটি সমাজকে সংগঠিত করে। যে বিষয়ে আলোচনা হবে সে বিষয়ে সমালোচনা হওয়া অস্বাভাবিক কোনো কিছু নয়। আমরা কোনো বিষয়ে আমাদের নিজস্ব মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করতে গিয়ে বিপরীত মতামতকে সমালোচনা করে থাকি। সমালোচনা যে-কেউ করতে পারে। অধিকাংশ মানুষ তার মতামত প্রকাশ করতে ভালোবাসে। সমালোচনাও চলে আসে সেখান থেকেই। সমালোচনা শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, কাজ বা কোনো বস্তুর ক্ষেত্রেও হতে পারে। সাহিত্য, শিল্পকর্ম, সামাজিক বিভিন্ন বিষয়েও সমালোচনা হতে পারে। সমালোচনা মানে এই নয় যে, কোনো বিষয় বা জিনিসের শুধু দোষ বা ত্রুটি খোঁজা। এটা কোনো বিষয় বা বস্তুর গুণমান বা এর পারিপার্শ্বিক বিষয় নিয়েও হতে পারে। তাই সমালোচনা কেবল নেতিবাচক নয়, ইতিবাচকও হতে পারে। যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে সমালোচনাকে ইতিবাচক, নাকি নেতিবাচক হিসেবে দেখব বা নেব।
সমালোচনা করার সময় মনে রাখতে হবে, কোন পরিপ্রেক্ষিতে বা দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং কী উদ্দেশ্যে সমালোচনা করব। সে বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান আছে কি না? কারণ সমালোচনা হওয়া দরকার বুদ্ধি বা জ্ঞানদীপ্ত, নাহলে সেখানে যুক্তির চেয়ে বিদ্বেষই ফুটে উঠবে বেশি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থের ‘ভারতী’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘কাঁচা আমের রসটা অম্লরস—কাঁচা সমালোচনাও গালিগালাজ। অন্য ক্ষমতা যখন কম থাকে তখন খোঁচা দিবার ক্ষমতাটা খুব তীক্ষ্ন হইয়া উঠে।’ কবিগুরু ঠিক কথাই বলেছেন। কারণ যখন জ্ঞানের পরিধি কম থাকে তখন যুক্তির চেয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ পায় বেশি। আর যুক্তির বাইরে যে কোনো সমালোচনাই বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে থাকে।
যে কোনো বিষয়ে আমাদের নিজস্ব মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি অথবা পর্যবেক্ষণ থাকতে পারে। আমাদের উচিত এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ইতিবাচক ও গঠনমূলকভাবে উপস্থাপন করা। শুধু নিজের জ্ঞানের ওপর নির্ভর না করে বরং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পুনঃপর্যালোচনা করা। অবশ্যই তা হতে হবে প্রমাণ ও যুক্তিনির্ভর। কারণ সমালোচনার উদ্দেশ্য অন্যকে শুধরানো, হেয় প্রতিপন্ন করা নয়।
গঠনমূলক সমালোচনা একটি শিল্প। গঠনমূলক সমালোচনা হলো একটি ব্যক্তিকে দেওয়া প্রতিক্রিয়া, যাতে সে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন করতে পারে। সাধারণ (যুক্তি ও প্রমাণহীন) সমালোচনা ও গঠনমূলক সমালোচনার মধ্যে পার্থক্য হলো গঠনমূলক সমালোচনা, যেখানে ভবিষ্যতে উন্নতি আনতে সঠিক উপায়গুলো আমাদের সামনে তুলে ধরে, সাধারণ সমালোচনা সেখানে আমাদের বর্তমান ব্যর্থতার ওপর আলোকপাত করে, যা আমাদের মনোবলে আঘাত হানে, আত্মবিশ্বাসের জায়গা নড়বড়ে করে তোলে। গঠনমূলক সমালোচনা একদিকে আমাদের উন্নতির পথে ধাবিত করতে অনুপ্রেরণা জোগায়, অন্যদিকে সাধারণ সমালোচনা আমাদের অবনতির দিকটা কটাক্ষ করে যা আমাদের আত্মবিশ্বাসে ভাঙন ধরায়। একমাত্র গঠনমূলক সমালোচনাই পারে আমাদের সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে। তাই আসুন, আমরা সমালোচনা নামক শিল্পকে নেতিবাচক উপস্থাপন ও গ্রহণ থেকে সরে এসে গঠনমূলকভাবে উপস্থাপন এবং ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে আমাদের অগ্রযাত্রাকে প্রবহমান রাখি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
