গণিত তথা অঙ্ক শাস্ত্রের ইতিকথা

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:২৪

মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব

পিথাগোরাসের মতে সংখ্যা হলো শব্দের তাল ও লয়ের মিথস্ক্রিয়ামূলক ঐক্য। পিথাগোরাস একদা রাজপথ দিয়ে আনমনা ভাবে হাঁটছিলেন এবং পথের ধারেই ছিল একটি কামারের দোকান। সেখান থেকে হাতুরী ঠোকার শব্দ কানে আসছিল। তিনি তখন একটি হাতুরীর শব্দের সাথে আরেকটি শব্দের ঐক্য খুঁজে পাচ্ছিলেন না বিধায় সোজা চলে গেলেন সেই দোকানে এবং সেখানে রক্ষিত চারটি হাতুরীর ওজন করে দেখলেন যে এদের ওজন হলো ৬,৮,৯,৭। আর এই সংখ্যাগুলোর সম্পর্ক নির্ণয় করলেন এই ভাবে ২x৩= ৬; ২ x৪ =৮; ৩ x৩ = ৯। কিন্তু তিনটি হাতুরীর মধ্যে মিল খুঁজে পেলেও একটি হাতুরীর ওজন ছিল সামঞ্জস্যহীন। তাই এর আওয়াজ ছিল বেসুরে, যা ৭ সংখ্যা বলে অভিহিত। তাছাড়া একই ধারাবাহিকতায় ১০ কে যাদুর সংখ্যা বলে মনে করতেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত ০ (শূন্য) আবিস্কার না হলেও, এই খালি স্থানে কি ব্যবহার করা হতো; তা এখন পর্যন্ত জানা না গেলেও সংখ্যা ভিত্তিক কার্যক্রম থেমে থাকেনি। তথ্য মতে জানা যায় যে, শূণ্য অর্থাত্ (০) আবিস্কার করেছেন ভারতের প্রাণ পুরুষ পণ্ডিত আর্যভট্ট। অবশ্য অনেকে বলে থাকেন যে, শূণ্যের (০) আদি ভূমি আরবে।  খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০ অব্দে ৬০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতির আবির্ভাব ঘটে। তত্কালীন সময় এটি ব্যবহার করতো মেসোপটেমিয়ানরা, তাদের ৩৬০ দিন সংবলিত ক্যালেন্ডারে। এদিকে এর স্থানীয় মান (Place Value) পদ্ধতির কথা ব্যাবিলনের অধিবাসীরা সর্ব প্রথম চিন্তা-ভাবনা করেছিল। এতদ্ব্যতীত সুমেরিয়ানরাও এই পদ্ধতি ব্যবহারে পিছিয়ে ছিল না। মজার ব্যাপার হলো- ৬০টি সংখ্যার জন্য তারা পৃথক পৃথক ভাবে ৬০ (ষাট) টি প্রতীক (Symbol) ব্যবহার করতো। তবে এটি হয়তো সহজ পদ্ধতি হতে পারতো। কিন্তু সমস্যা বাধে শূণ্যকে নিয়ে। কেননা এর কোন প্রতীক ছিল না। তবে তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে এর অবস্থান+১ এবং -১ এর মধ্যে। তাই হিসাব করার সময় হয়তো স্থান খালি রেখে শূণ্য (০) বুঝাতো বলে প্রতীয়মান হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ হতে এমন একটি প্রতীক দ্বারা শূণ্যকে প্রকাশ করা শুরু হয়, যার সাথে সাথে ষাট ভিত্তিক সংখ্যার যোগ সূত্রের ব্যবস্থা প্রভুত সমাদৃত হতে থাকে এবং একই সাথে এটি পরিমার্জন অব্যহত থাকে। এদিকে খ্রিস্টের জন্মের পরে গ্রীস এবং এই উপ-মহাদেশে ১০ ভিত্তিক সংখ্যার আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু তাদের ঐ সংখ্যার আওতায় দশক কিংবা শতকের ক্ষেত্রে স্থানীয় তেমন কোন প্রতীক ছিলো না। তারা কেবল গণনার ক্ষেত্রে ১০টি প্রতীকই পুণ: পুণ: ব্যবহার করতো। কিন্তু সময় তো আর বসে থাকে না। কালের পরিক্রমায় ৫০০ খ্রিস্টাব্দ এসে যায়। এর কোন এক সময়ে আর্যভট্টকে ০ (শূণ্য) আবিস্কারের মর্যাদা দেয়া হয় এবং সেই থেকে শূণ্য (০) পুরাদমে ব্যবহূত হতে থাকে। এদিকে সেই সময়ে এই উপ-মহাদেশের একজন গণিত বিশেষজ্ঞ স্থানীয় সংখ্যার আদলে স্মারক লিপি প্রণয়ন করেন। তিনি প্রথম ৯টি সংখ্যার পুরনো প্রতীকগুলো বাদ দিয়ে সংশোধিত প্রতীকগুলো আরো উন্নতি সাধন করেন। আর ৮২৫ খ্রিস্টাব্দে আরবের একজন গণিতবিদ আল-খোয়ারেজমি উপমহাদেশীয় সংখ্যা এবং তাঁর তৈরী প্রতীক নিয়ে একটি যুগান্তকারী পুস্তক রচনা করেন। তত্পর একাদশ শতাব্দীতে ১০ ভিত্তিক সংখ্যা ব্যবস্থা স্পেন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইউরোপ ছিলো খুবই সন্দেহপ্রবণ এবং পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তেমন মাথা ঘামাতো না বিধায় এই কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকে। তখন বিজ্ঞানীরা ১০ ভিত্তিক সংখ্যা ব্যবস্থা নিয়ে দোটানায় পড়েন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ১০ না হয়ে তো অন্য সংখ্যা হতে পারতো? কিন্তু মানুষের সবচেয়ে অপরিহার্য ও আরাধ্য অঙ্গ দুই হাতের ১০টি আঙ্গুল বিবেচনার ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব পায়। এদিকে ভগ্নাংশ প্রকাশের ক্ষেত্রে সহজ উপায় ছিল না বলে জটিলতা বাঁধে। কিন্তু ধীরে ধীরে হিসাব ও উপাত্তের (Data) স্বার্থে ষোড়শ শতকের দিকে দশমিকের আবির্ভাব হয় এবং এক্ষেত্রে ১৬১৭ সালে বিখ্যাত গণিতবিদ জন নেপিয়ার দশমিকের চিহ্নটি (.) সংযোজন করেন।  যদি দার্শনিকভাবে সংখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে প্রতীয়মান হয় শূণ্য (০) এবং এক (১) ছাড়া অন্য সংখ্যার তেমন কোন মৌলিকত্ব তথা ভিত্তি নেই এবং প্রকৃতিগতভাবেও সমর্থিত নয়। শুধু হিসাবশাস্ত্রের স্বার্থে এবং সুবিধার্থে ২ থেকে ৯ পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বাইনারী পদ্ধতির আওতায় শূন্য (০) এবং ১ (এক) প্রতিষ্ঠিত, যা বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির যুগের কম্পিউটারের একমাত্র ভাষা। তবে দশমিকের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৯ পর্যন্ত এই আটটি সংখ্যা (Digit) অধিকতর উপযোগী। অবশ্য বিজ্ঞান যে ভাবে এগুচ্ছে, হয়তো আগামীতে এমন একদিন আসবে ন্যানো বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমিতকরণের (Standardization) মাধ্যমে কেবল ০ (শূণ্য) এবং ১ (এক) টিকে থাকবে, বাকী ৮টি সংখ্যা থাকলেও কেবল দশমিকের (Decimal) আবর্তে চলমান থাকবে। আর এর স্বপক্ষে যুক্তি হলো ১ (এক) যদি একক বা টোটাল হয়, সেখানে সমজাতীয় ২ (দুই)টি একক বা টোটাল সঙ্গতকারণেই হতে পারে না।

                পরের অংশ আগামীকাল