ছয় বছরেও ভুলতে পারিনি পিনাক-৬

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২০, ২১:৪১

আরজু আফরিন ক্যাথি

আসছে আগস্টের ৪ তারিখে পিনাক-৬ লঞ্চডুবি ঘটনার ছয় বছর হতে চলল। মাদারীপুরের কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে ৩ শতাধিক যাত্রী নিয়ে পিনাক-৬ সেদিন রওনা করেছিল মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার উদ্দেশে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী পিনাক-৬ সেদিন প্রবল স্রোতের কবলে পড়ে পদ্মার বুকে, মাওয়া ঘাটের কাছে এসে ডুবে যায়।

বাংলাদেশে নদীপথের দুর্ঘটনাগুলো যতটা না প্রাকৃতিক, তার চেয়ে বেশি অবহেলাজনিত বলেই আমার ধারণা। পিনাক-৬ লঞ্চডুবির কারণ যে শুধু খরস্রোতা পদ্মার উত্তাল ঢেউই নয়, একথাও নিঃসন্দেহে বলা যায়। বাংলাদেশের স্থল ও জলপথে চলাচল করা যানবাহনগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের প্রবণতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে পিনাক-৬ যেন আগের সব বেপরোয়া পরিবহনকেও হার মানিয়েছিল! আগস্টের শুরুতে—পদ্মা তখন উত্তাল, ঘোষণাকরা হয়েছিল ২ নম্বর সতর্ক সংকেতও। নিয়মানুযায়ী, এমতাবস্থায় ৬৫ ফুটের কম দৈর্ঘ্যের লঞ্চ চলাচল করা নিষিদ্ধ থাকলেও, সব বিধিনিষেধ তোয়াক্কা করে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চার-পাঁচ গুণ যাত্রী নিয়ে রওনা করে ৫২ ফুট (সাড়ে ১৯ মিটার) উচ্চতার পিনাক-৬। পরিণতি? উদ্ধারকৃত ৪৯ জনের লাশ, বেওয়ারিশ হিসেবে শিবচরে দাফন করা ২১ জনের মৃতদেহ, সরকারি হিসাবেই নিখোঁজ থাকা ৬১ জন যাত্রীর পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের গগনবিদারী চিত্কার। সে যেন হয়ে উঠেছিল এক মৃত্যুপুরী!!

প্রায় ছয় বছর আগের এই বিষাদময় স্মৃতিচারণ কেন করলাম আসা যাক সেই প্রেক্ষাপটে, গত মাসের ২৯ তারিখে সকাল বেলায় বহু দিন পরে হঠাত্ চট্টগ্রাম থেকে এক আত্মীয়ের টেলিফোন পেলাম। উত্কণ্ঠার সঙ্গে জানতে চাইলেন বাসার সবাই নিরাপদ আছি কিনা। ঘটনা জিজ্ঞাসায় জানতে পারলাম, আজ সকালে মর্নিং বার্ড নামের একটা ছোট্ট লঞ্চ ৬০/৭০ জন যাত্রী নিয়ে ডুবে গেছে, লঞ্চে থাকা যাত্রীদের অধিকাংশেরও বেশি মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে টেলিভিশন চালু করে দেখলাম, ট্রলারভর্তি করে লঞ্চডুবিতে উদ্ধার করা ৩২ জনের লাশের ছবি। কী নির্মম!! গত ছয় বছরেও মুন্সীগঞ্জবাসী পিনাক-৬ দুর্ঘটনার কথা ভুলতে পারেনি, এর ওপর আবার মর্নিং বার্ড ট্র্যাজেডি—এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা!

মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে এ দুটো লঞ্চ দুর্ঘটনায় অমিল কী কী আছে না জানলেও বেশ কিছু মিল লক্ষ্য করেছি। চালকের অবহেলা, জাহাজ মালিকের উদাসীনতা ও অজ্ঞতা, নির্মাণে ত্রুটি, উভয় ঘটনায় লঞ্চগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন, দুটো লঞ্চই ফিটনেসবিহীন এবং নামমাত্র জালিয়াতি সার্টিফিকেটধারী, লঞ্চডুবির পরে উভয় ঘটনায় উদ্ধার তত্পরতায় দীর্ঘসূত্রতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতার অভাব, তড়িঘড়ি করে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন এবং সেই কমিটিতে টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞদের দৃশ্যমান অনুপস্থিতি, বিআইডব্লিউটিএ-নৌ বিভাগ-লঞ্চ মালিক-ইজারাদারকে ঘিরে চলমান ব্লেইম গেইম, নিহতের স্বজনদের আর্থিক সাহায্য প্রদানের নামে প্রহসন আর নিখোঁজ স্বজনের প্রতীক্ষা! এগুলোই সাদৃস্য!

শেষ করার আগে বলি, বিআইডব্লিউটিএ-এর তথ্যমতে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৮৭ দশমিক ৮০ মিলিয়ন মানুষ নদীপথে যাতায়াত করে। কারণ, নদীপথ তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল, আরামদায়ক এবং পরিবেশবান্ধব। অথচ দিনে দিনে নদীপথ যেন পরিণত হচ্ছে আতঙ্কের সমার্থক শব্দে! ৬১৫ কিলোমিটারের পদ্মা সেতুর কাজ সম্পন্ন হলে দক্ষিণের ২০টি জেলাকে সরাসরি ঢাকার সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত করা সম্ভব হবে। ফলে অধিকাংশ যাত্রীই হয়তো বাধ্য হয়ে নদীপথের এই মৃত্যু ঘাঁটিকে আর যাতায়াতের পথ হিসেবে বেছে নেওয়া থেকে মুক্তি পাবে। এই মুক্তি যত দ্রুত পাওয়া যাবে জাতির জন্য ততোই মঙ্গল। নৌদুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে কার্যকরী আইন, প্রচলিত আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন অতিব জরুরি। নতুবা, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নতুন কোনো পিনাক-৬ কিংবা মর্নিং বার্ড ট্র্যাজেডির সংবাদ শুনলে আর বিস্মিত হব না। দুঃসংবাদ হজম করাকেই না হয় অভ্যাসে পরিণত করব!!!

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়