ইত্তেফাক রিপোর্ট
চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। আগের অর্থবছরের সঙ্গে মিল রেখেই এ খাতে প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে মুদ্রানীতির ঘোষণাপত্র আপলোড করা হয়েছে। আগে সব সময় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হতো, যেখানে সাংবাদিকেরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ পেতেন। কোনো সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, তারও ব্যাখ্যা জানতে চাইতেন সাংবাদিকেরা। এবারই প্রথম একপাক্ষিকভাবে ওয়েবসাইটে মুদ্রানীতি প্রকাশ করল বাংলাদেশ ব্যাংক। অথচ করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও স্থবির হয়ে পড়েছে। এই স্থবির অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এ বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করলে ভালো ফলাফল আসতে পারত বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মত দিয়েছেন। দেশের সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে ছোট থেকে শুরু করে বড় বড় মিটিং-সিটিং যেখানে ওয়েবইনারে হচ্ছে, সেখানে মুদ্রানীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একপাক্ষিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করল, সে বিষয়ে প্রশ্ন রাখার অবকাশ থেকেই যাচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।
বাংলাদেশ ব্যাংক আগে প্রতি ছয় মাসের আগাম মুদ্রানীতি ঘোষণা করলেও গত অর্থবছর থেকে তা এক বছরের জন্য করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরলেও অর্জিত হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এই হার যে শুধু করোনা ভাইরাসের প্রভাবে কমেছে, তা নয়। গত অর্থবছরের শুরু থেকে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল কমতির দিকে।
মুদ্রানীতি ঘোষণায় লিখিত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, করোনা ভাইরাস মহামারিতে বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন বিনিয়োগ জোরদারকরণে বেসরকারি খাতে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২০-২১-এর মুদ্রানীতি ভঙ্গিকে স্পষ্টতই সম্প্রসারণমূলক ও সংকুলানমুখী উল্লেখ করে গভর্নর জানান, মুদ্রানীতির মূল কাজ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক অর্থাত্ কোভিড-১৯-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির যোগফল থেকে প্রাপ্ত নমিনাল বা বাজারমূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর সঙ্গে অর্থের আয় গতির পরিবর্তন সমন্বয় করে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের (যা মুদ্রানীতির মধ্যবর্তী লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত) প্রয়োজনীয় প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয় ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে বৈদেশিক লেনদেন খাতের সম্ভাব্য গতিধারা বিবেচনা করে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের অন্যতম উপাদান ব্যাংক ব্যবস্থার নিট বৈদেশিক সম্পদের প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের (১০ দশমিক ২ শতাংশ) তুলনায় অনেক কম।
এই অর্থবছরে নিট বৈদেশিক সম্পদের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সম্প্রসারণমূলক ও সংকুলানমুখী মুদ্রানীতি ভঙ্গির কারণে নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। সে হিসাবে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৪ দশমকি ৮ শতাংশ। তবে গত অর্থবছরে এক লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও অর্জন হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। এদিকে ব্যাংকে অর্থের জোগান বাড়াতে রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদ কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করে, তখন তার সুদের হার ঠিক হয় রেপোর মাধ্যমে। মুদ্রানীতিতে রেপোর হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে। রিভার্স রেপোর মাধ্যমে বাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখে। এক্ষেত্রে সুদের হার ৭৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে।
