২০১৯ সাল শুরু হওয়ায় স্বাধীন বাংলাদেশ ৪৮বছরে পা দিয়েছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে যে শিশু জন্ম নিয়েছিল তার বর্তমান বয়স ৪৭ বছর, যা একজন মানুষের জন্য মোটেও কম সময় নয়। ২৫ বছর বয়সে একজন মানুষ সাধারণত উপার্জন শুরু করে। সে হিসাবে কর্মজীবনের ২২ বছর বয়সে ব্যক্তিগত উন্নতির একটি সুন্দর পর্যায়ে থাকার কথা। রাষ্ট্রীয় জীবনেও তাই হওয়ার কথা, দেশের অর্থনীতি ও মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার কথা। ব্যক্তি জীবনে কর্মজীবন শুরুর আগের পর্ব হলো সক্ষমতা অর্জন করা। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও এতদিনে দেশের মানুষকে শিক্ষিত করে একটি মানবসম্পদে পূর্ণ সমাজ তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। বর্তমানে সরকারের কাজ এবং পরিকল্পনার গতি হওয়ার কথা ৪জি সেবার মতো। কারণ, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরুই হয়েছিল অর্থনৈতিক মুক্তির প্রয়োজনে। ১৯৭১ সালের আগে এঅঞ্চলে কার্তিক, চৈত্র মাসে সমাজে খাবারের জন্য হাহাকার শোনা যেত। পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের জন্য এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। ১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন দেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের অধিকাংশ ছিল গরীব ও অশিক্ষিত। সেই মানুষকে মানবসম্পদে রূপান্তরের প্রথম এবং প্রধান পদক্ষেপ ছিল তাদের শিক্ষিত করা।
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ জন্মগতভাবে কিছু ক্ষমতা নিয়ে জীবন শুরু করলেও সময় এবং পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আত্মতৃপ্তিসহকারে জীবনযাপনের জন্য তার প্রয়োজন কিছু বাড়তি সক্ষমতা-যা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অধিকাংশ মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় শিক্ষাখাতের ব্যয় কষ্টসাধ্য, অনেকের জন্য অসম্ভব। অবশ্য বিশ্বের প্রায় সকল দেশে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যয় সরকারের কাঁধেই রয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাংবিধানিকভাবে যে কয়টি মৌলিক অধিকারের কথা বলা আছে তার মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। ১৯৭২ সাল থেকে সব সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কতটুকু মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে? ২০১৭ সালের এক সংবাদে প্রকাশ, ‘পঞ্চম শ্রেণি পাস করা ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে শতকরা ৭০ জন পড়তে, লিখতে এবং গণনা করতে পারে না’ (সূত্র:The Financial Express, ২৪/০১/২০১৭)। সরকারের দাবি-শিক্ষায় বেশ উন্নতি হচ্ছে, পাসের হার প্রতি বছর বাড়ছে। শিক্ষার হারের উন্নতি হচ্ছে কিন্তু শিক্ষা মানসম্মত হচ্ছে না। সরকারের উন্নয়নের সুফল জনগণের ঘরে যায় তাদের আয় উপার্জন বৃদ্ধির মাধ্যমে। এক্ষেত্রে জনগণ জানতে চায় নতুন নতুন চাকরির খবর, তাদের বেতন বৃদ্ধির সংবাদ। ২০১৬ সালের ইউএনডিপির মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হবে ১২ কোটি ৯৮ লাখ যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭০ জন। সরকারের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের কার্যপদ্ধতি এমন হতে হবে যেন এই সংখ্যক মানুষ দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হয়। তাদের জন্য সৃষ্টি হয় প্রয়োজনীয় সংখ্যক নতুন নতুন পদ। মনে রাখতে হবে, দক্ষতা এবং কাজের জোগান না থাকলে জাতীয় সম্পদের চলমান অপচয় রোধ করা যাবে না।
মানবসম্পদ সৃষ্টির প্রথম কাজ উপযুক্ত শিক্ষা। বর্তমান বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন অত্যাবশ্যক। এই শিক্ষাপ্রদানের দায়িত্বে আছে বাংলাদেশের সরকার। তবে প্রাথমিক শিক্ষার সমস্ত ব্যয় সরকারের থাকলেও উচ্চ মাধ্যমিকের একটি বড় অংশ থাকে সরকারের হাতে। এখানে উল্লেখ্য, চিকিত্সা এবং খাদ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা ব্যতীত দারিদ্র্য বিমোচন বাংলাদেশে অসম্ভব। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সরকারের দায়িত্ব মানুষের মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ করা। দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির দুর্বলতায় বাংলাদেশে সম্পদ বণ্টনে অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান না করেন তাহলে আর্থিকভাবে সচ্ছল নয় এমন পিতার সন্তান উপযুক্ত এবং মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। একই সঙ্গে যদি থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিত্সকেরা সেবা দান না করেন তাহলেও অসচ্ছল মানুষের অসচ্ছলতা আরো বৃদ্ধি পাবে। কারণ মানুষের কাছে শিক্ষার চেয়ে চিকিত্সার চাহিদা বেশি। এমন একটি কারণেই হয়ত চিকিত্সা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে যায়। তবে অনেক কিছুর মধ্যেও সরকারের সফলতাও আছে। বাংলাদেশের গড় আয়ু বাড়ছে, শিশু মৃত্যু হার কমছে, অনাহারে মারা যাওয়ার সংবাদ পাওয়া যায় না। মানুষ উন্নয়নকে দেখতে চায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে। ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন পরোক্ষ। রাস্তা, পুল হলে মানুষ সহজে যাতায়াত করতে পারবে, কৃষিপণ্য সহজে এবং বেশিদামে বাজারজাত করতে পারবে কিন্তু তারও আগে দরকার সন্তানের শিক্ষা ও চিকিত্সার নিশ্চয়তা। সম্প্রতি এক সংবাদে প্রকাশ-বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) তথ্য মোতাবেক দেশের মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শতকরা ৭১ জন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে। দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনায় তাদের সন্তান যেন সুশিক্ষার আলো পায় তা নিশ্চিত করতে পারলেই সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি টেকসই হবে। Sustainable Development Goals এর আলোকে বাংলাদেশ সরকারের কর্মসূচি হবে টেকসই। উন্নয়নের প্রধান শর্ত দারিদ্র্য বিমোচন এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
সরকারের ২০১৬ সালের হিসাবে বাংলাদেশের প্রাক্কলিত জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৮ লাখ (সূত্র:বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮) মতান্তরে ১৭ কোটি। একই সূত্র অনুযায়ী ২০১৬ এর তথ্য মোতাবেক শিক্ষিতের গড় হার ৭১%। ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে এককোটির বেশি বাংলাদেশি বিদেশে শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত যার অধিকাংশ যুবক। দেশে কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি লোক বেকার। সমস্যাটি কঠিন এবং ভয়াবহ, কারণ পরিচিত জনদের কথা আমরা সবাই কমবেশি জানি। সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে, সময় নষ্ট না করে আগামি দিনের বাংলাদেশের উন্নয়নকে দৃশ্যমান করতে হবে। দৃশ্যমান করার জন্য বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাইমারি শিক্ষায় সম্পৃক্ত ১ কোটি ৭২ লাখ ৫১ হাজার ৩৫০ জন (সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮) ছেলে-মেয়েকে মানবসম্পদে রূপান্তরের নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাথমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা ক্ষেত্রের অপচয় রোধ করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি ও মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগদানের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ৪২ থেকে কমাতে হবে, পলিটেকনিক্যাল ট্রেনিংসহ বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করে ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের প্রায় ১৩ কোটি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে সম্মানজনক পদে নিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে।
n লেখক : এফসিএ, চেয়ারম্যান, এডুকেশান ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশান—ইডিএ
