শীতকাল হলো বাংলাদেশের ষড়ঋতুগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বিশেষ কাল। এই সময়ই দেখা যায় মূলত বাংলার আবহমান সংস্কৃতির প্রকৃত চিত্র। বাংলার সংস্কৃতির অকৃত্রিম আলেখ্য ফুটে ওঠে এই সময়। এই শীতকালের মধ্যেই লুক্বায়িত বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি। মাঘ মাসে সারা দেশে তথা গ্রাম-বাংলার সবুজ ধান পাতা ছড়ায় তার রঙের অপূর্ব সমারোহে। আর সেই সবুজের হিল্লোলে দিশেহারা হয়ে কবিরা বার্তা প্রেরণ করে তার কবিতার মাধ্যমে। তেমনি কুয়াশার আস্তরণ মাড়িয়ে শীতার্ত মাঠ কিষাণ ছুটে যায় রাত পোহানোর আগে। গোটা শীতকাল ধরে মাঠের পর মাঠে দেখা যায় রবিশস্যের সমারোহ। ধান পাতার গন্ধ মৌ-মৌ করে প্রান্তরের বাতাস, হরেক রকমের শাক-সবজি রঙে-রঙে ভরে উঠে গ্রাম-বাংলা ও শহরের আনাচে-কানাচে। মূলত হিমশীতল প্রকৃতির গর্ভে অংকুরিত হয় বসন্তের ভ্রূণ। বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি মূলত শীতের এই আমেজের সঙ্গে মিশে আছে। বিশেষ করে এ দেশের গ্রামাঞ্চলে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিনের সঙ্গে মিশে আছে নবান্ন উত্সব। শীতের সকালে পিঠ পেতে রোদ পোহানোর দৃশ্য ভুলে না যাওয়ার মতো। গ্রাম অঞ্চলের শীতের সকাল-সন্ধ্যায় খড় জড়ো করে আগুন পোহানোর দৃশ্য আজও অমলিন। বুড়োরা আজো পোহায় ‘আইলসার আগুন।’ পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের দেখা যায় শীতের সন্ধ্যা-সকালে কুড়ানো খড়-কাগজ জ্বেলে গা সেঁকতে। এসব করুণ আলেখ্য নিয়ে প্রতিবার আসে শীত।
কুয়াশা ঢাকা ভোরে কনকনে শীতের মাঝে গায়ে গরম চাদর জড়িয়ে রসাল মিষ্টি পিঠা খাওয়ার আনন্দটা উপভোগ করেনি এমন মানুষ আছে বললে বিশ্বাস করতেই কষ্ট হবে। শীত মানেই পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায় সর্বত্রই। আর আমাদের এ দেশে শীতের সময় পিঠা উত্সব হবে না, তা কী করে হয় ? ঢাকাসহ সারা দেশেই শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় পিঠা উত্সবের প্রস্তুতি। বিভিন্ন জায়গায় পিঠা উত্সবের আমেজ নিয়ে বাহারি, মজাদার পিঠা খাওয়ার জমজমাট আয়োজন করা হয়। পাটিসাপটা, দুধকুলি, ভাজাকুলি, নারিকেলী, ভাপা, চিতই, নকশিপিঠা ইত্যাদি। শীতের দুধে ভেজানো পিঠা কার রসনাকে উসকে না দেয়? একসময় পিঠা ছিলো গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য। কালের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখন তা শহরের বিলাস খাদ্যে নাম লিখিয়েছে। ফুটপাত থেকে নামি-দামি খাদ্যভাণ্ডার এখন দেখা যায় পিঠার বিশেষ মেন্যু, বিশেষত শীতকালে। একসময় পিঠার পাশাপাশি মোয়া, মুড়কি, লাড্ডু, বরফি ছিলো প্রায় অনিবার্য পদ। তবে বাঙালির খাদ্য রুচিতে বাস্তবিকই একটি স্বাতন্ত্র্য রূপ দিয়েছে শীতকালের খেজুরের রস। সন্ধ্যা কিংবা ভোরবেলায় টলটলে খেজুরের রস পানের ঐতিহ্য এদেশে প্রাচীন, তা থেকে ঘন করে জ্বাল দেয়া চৌরস দিয়ে শীতের সকালে মুড়ি খাওয়া গ্রাম-বাংলার চেনা দৃশ্য। আরেক বস্তু খেজুরের পাটালি। শীতে জমে থাকা মাছের ঝোল, মাষকালাইয়ের ডাল আর কড়কড়ে ভাতের স্বাদ গ্রাম-বাংলার জনপ্রিয়। ভুরি-ভোজনের এ ঋতুতে হরেক রকম তরতাজা সবজি শীতের খাবার-দাবারে স্বভাবতই যোগ করে ভিন্ন স্বাদ। এ যেন বাঙালির প্রাচীন পার্বণ, অবশ্যই শীতের পার্বণ।
বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে একসময় শীতকালে অনেক ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। গ্রাম-বাংলা এসময় শীতসন্ধ্যায় কেচ্ছা বলার ধুম পড়তো। জারি, সারি, বাউল, হাছনরাজার গানের আসর বসতো পাড়ায়-পাড়ায়। পাঠের সুর হিমেল বাতাসে ছড়িয়ে পড়তো গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। পৌষের জ্যোত্স্নায় উঠোনে উঠোনে বসতো ‘বিষাদ সিন্ধুর’ পাঠের আসর, রাতভর মারফতি, মুর্শিদী গানের সেই শীত তাড়ানো আনন্দ এখন বিরল। এখন আর শীতের মধ্যরাতে কবিয়ালদের ঢাক-ঢোলক ছন্দে মুখর হয় না। একসময় উত্তর বাংলার গম্ভীরা গান ছিলো শীত ঋতুর প্রধান বিষয়। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা হারিয়ে যাওয়ার পথে। গ্রাম-বাংলা শীত সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান বিষয় ‘যাত্রাপালা’ এবং ‘নাটক।’ শীতের শুরু থেকে সাড়ম্বরে চলতো আয়োজন। পাড়ায় পাড়ায় জমে উঠতো যাত্রা-নাটকের রিহার্সেল। খড়ের বিছানায় বসে রাতভর যাত্রা দেখতো দর্শকরা। আজকাল যাত্রাপালা নেই বললেই চলে। কিছুটা শহুরে আদলে নাট্য মঞ্চস্থ হয়। কিন্তু কোথায় যেন কমতি থেকেই যায়। শিল্পী আছে, সঙ্গীত আছে, শ্রোতাও আছে কিন্তু সেই স্বতঃস্ফূর্ততার স্রোতে আজ শুধু ভাটার টান। শহরে শীত সংস্কৃতির তাত্পর্য ভিন্ন। এখন হারিয়ে গেছে অনেক কিছুই। শীতের রাতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসর আজকাল বিরল। ক্লাসিক গানের জলসা তেমন জমে না। নানা কারণে মানুষের রুচি বদলেছে। এখন লোকের পছন্দ ব্যান্ড সংগীত। এসব আসরে বেশি পয়সায় টিকেট কেটে আধুনিক দর্শকরা উপভোগ করে বিদেশি শিল্পীদের গান। শীতকালে প্রাচীন সংস্কৃতি ‘যাত্রাপালা’ এখন শুধু স্মৃতি। তবে আগের সেই স্বাতন্ত্র্য নেই, নেই সারল্য।
n লেখক: শিক্ষার্থী, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা
