দেশে দেশে মানুষে মানুষে যে বৈষম্য বিদ্যমান ছিল, তা করোনা নতুন মাত্রায় উন্মোচন করেছে। এ সময়ে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে আয়-বৈষম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, মেক্সিকো এমনকি পৃথিবীর অনেক কল্যাণমূলক রাষ্টেও বৈষম্য চোখে পড়ার মতো। সমাজবিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা দেখিয়েছেন, ‘তীব্র বৈষম্য অনেক দিক থেকেই এক সামাজিক ক্ষত। বৈষম্য যত বেশি, সার্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ততই নাজুক হয়। একই কারণে মহামারিতে মৃত্যুর ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়। পাশাপাশি উচ্চ বৈষম্য মানে নিম্নতর সামাজিক সংহতি, কম সামাজিক বিশ্বাস এবং অধিকতর রাজনৈতিক বিভেদ। এই অবস্থা সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলার সামর্থ্য কমিয়ে দেয়।’ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য সীমারেখা নির্ধারণে জাতিসংঘ এখন পর্যন্ত ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে বৈষম্যের সীমারেখা টেনে রেখেছে। যেমন গরিব দেশের মানুষের জন্য দারিদ্র্যসীমা ১ দশমিক ৯০, ডলার অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্যসীমা হিসেবে দৈনিক গড় আয় ধরা হয়েছে ১৫ ডলার। করোনা মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে— বৈষম্যভিত্তিক উন্নয়ন প্রকৃত উন্নয়ন নয়, উন্নয়ন হতে হবে দরিদ্রবান্ধব, প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশবান্ধব ও সমতাভিত্তিক।
বিআইডিএসের জরিপ দেখিয়েছে, দেশে নতুন দরিদ্র ১ কোটি ৬৪ লাখ। করোনার সময়ে শহরের শ্রমিকদের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ, গ্রামে ১০ শতাংশ। ব্র্যাকের সর্বশেষ গবেষণা অনুযায়ী করোনার অভিঘাতে আয় কমেছে ৯৫ শতাংশ মানুষের। ৩ শতাংশ লোক চাকরি থাকলেও বেতন পাননি। আর দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে যারা কাজ করেন, তাদের ৬২ শতাংশ কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। দেশের বাস্তব অবস্থা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লিখিত সংখ্যার চেয়ে বেশি বই কম নয়। এই মহামারির মধ্যেই সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল লোকসানের কারণে পিপিপির মাধ্যমে চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া তালিকাভুক্ত বদলি ও দৈনিকভিত্তিক ২৬ হাজার শ্রমিককে নিশ্চিত বেকারত্বের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
করোনা মহামারিতে যুক্তরাজ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ১০ শতাংশের বেশি রেস্টুরেন্ট। করোনায় প্রবাসীরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় দেশের রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে দেশের মধ্যে হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসা বন্ধ থাকায় বা সীমিত আকারে চলায় সেখানেও অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। জনসংখ্যা অনুপাতে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম সৃষ্টি হওয়ায় কতিপয় কোটিপতি ছাড়া অধিকাংশ মানুষ অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনীতির চাকা সচল করতে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশের মানুষও চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু সরকারি কর্মক্ষেত্র এভাবে সংকুচিত হলে মানুষ যাবে কোথায়? শুধু খাদ্যসহায়তা বা কিছু অর্থসহায়তা দিয়ে এত ব্যাপকসংখ্যক মানুষের বেকারত্ব মোকাবিলা সম্ভব নয়।
ঢাকা শহর থেকে কর্মহীন হাজার হাজার মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে কী করবে, তা অনেকেরই অজানা। বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি-প্রকৃতি এককেন্দ্রমুখী হওয়ায় গ্রামে এমনকি জেলা বা বিভাগীয় শহরেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। এ সময়ে ব্যক্তি উদ্যোগে ছোট-বড় খামার, মাছের ঘের বা ফল-ফসলের উত্পাদন যতটা বেড়েছে, তা প্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ ততটা বাড়েনি। এ দেশের ধনী ব্যবসায়ীরা দেশের বাইরে টাকা পাঠিয়ে সেখানে গড়ে তুলেছেন দ্বিতীয় হোমল্যান্ড। দেশে কাজের সুযোগ না থাকায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন কোটি কোটি দক্ষ আধাদক্ষ শ্রমিক। সেখানে তারা খেয়ে, না খেয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যে অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন তা সরকারের চাকাকে সচল করেছে আর তৈরি করেছে ব্যক্তিগত ছোট-বড় ইমারত। তাদের অনেকেই করোনাকালে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাকিনজি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ঐ প্রতিবেদনে বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে তা মোকাবিলায় কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। ম্যাকিনজি তার প্রতিবেদনে বলেছে, এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে একসঙ্গে মিলে মানুষকে চাকরির নিরাপত্তা দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর ছাড়, ব্যাংক লোন বা সরকারের পক্ষ থেকে কর্মীদের চাকরির সুরক্ষা দিতে হবে। প্রণোদনা প্যাকেজগুলো সঠিক, দক্ষতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে প্রকৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সংকট হ্রাস-বৃদ্ধি।
কৃষি এদেশের প্রাণ। প্রকৃত কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ ও ন্যায্যমূল্য ব্যবস্থা চালু করা দরকার। প্রতি বছর আমাদের দেশের অনেক ফসল শুধু গুদামজাত ও প্রক্রিয়াজাত করার অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। গত এক যুগ ধরে সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা ২২ লাখ টনেই আটকে আছে। বর্তমান অবস্থায় খাদ্যনিরাপত্তার সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। এরই মধ্যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে জেলায় জেলায় বন্যা ও নদীভাঙন। উত্তরাঞ্চলে বন্যা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চল তলিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের আশপাশেও বন্যা আঘাত হেনেছে। ইতিমধ্যে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় কৃষক, শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষকে বাঁচিয়ে রেখে তাদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা দিতে না পারলে রাস্তা-ব্রিজ বা ভবনের উন্নয়ন কোনো কাজেই আসবে না।
n লেখক :নারীমুক্তি আন্দোলন কর্মী
