পালটে গেছে দাসিয়ারছড়া

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২০, ২৩:০১

বিগত কয়েক বছরে বিলুপ্ত ছিটমহলে বর্তমান সরকারের ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ আর বাসিন্দাদের কঠোর পরিশ্রমে পালটে গেছে দাসিয়ারছড়ার মানুষের জীবনযাত্রা। ছিটমহল এখন শুধুই ইতিহাস এবং অতীত স্মৃতি। ষষ্ঠ বর্ষে পদার্পণে ছিটমহলে নানা  অনুষ্ঠান করার কথা থাকলেও প্রাণণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে তা কাটছাঁট করা হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই বাংলাদেশ-ভারত মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তির বাস্তাবায়ন ঘটে। দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনার পর ১৬২টি ছিটমহল একীভূত হলে তার বাসিন্দারা পছন্দমতো দেশের নাগরিক হতে পেরে মহাখুশি। বিলুপ্ত ছিটমহল বিলুপ্তির ষষ্ঠ বার্ষিকী দাসিয়ারছড়ার নাগরিকেরা স্বল্প পরিসরে আয়োজন করেছে। এর মধ্যে আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা। এরপর রাত ১২টা ১ মিনিটে ৬৮টি মোমবাতি প্রজ্বালন শেষে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হবে। এছাড়া রাতে দাসিয়ারছড়ার প্রতিটি বাড়িতে আলোকসজ্জাসহ শনিবার আয়োজন করা হয়েছে হা-ডু-ডু খেলা। পাশাপাশি মসজিদে মসজিদে মিলাদ মাহফিল ও মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা করা হবে। ছিটমহল বিনিময়ের পাঁচ বছরে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রাপ্তি থাকায় মহাখুশি বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা।

ফুলবাড়ী উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে প্রায় ২২ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয় দাসিয়ারছড়া উন্নয়নে। এর মধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন, ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডির মাধ্যমে ২৪ কিলোমিটার পাকা রাস্তা, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টার,  ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি মসজিদ, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মন্দির, ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ব্রিজ, ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি হতদরিদ্র পরিবারের বসতবাড়ি নির্মাণ, ২২ কিলোমিটার পাকা সড়ক, দুস্থ পরিবারে স্যানিটারি ল্যাট্রিন ও নলকূপ স্থাপন, একটি করে শ্মশানঘাট, শহিদ মিনার, নীলকমল নদে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ, ১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের চারটি ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ, বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহের জন্য ৪৫টি নলকূপ স্থাপনসহ ব্যাপক সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একটি দাখিল মাদ্রাসা গড়ে তোলা হয়েছে। সেই সঙ্গে দীর্ঘ ৬৮ বছর পিছিয়ে থাকা বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে দ্বিতল ডিজিটাল সার্ভিস, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার মুজিববর্ষে উপহার দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ভূমি জটিলতার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নিরসন হয়ে গেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ১ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪৪ একর ও সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত ৯ একর জমির প্রাক্জরিপ শেষ করে খতিয়ান হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকল্পে স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক তিনটি  কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে। দাসিয়ারছড়াসহ বিলুপ্ত ছিটমহলে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তির ৭৫ দিনের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫৬২ পরিবারে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এখন আর কোনো বাড়িই নেই, যেখানে বিদ্যুত্ নেই। দেওয়া হয়েছে দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। ডিজিটাল সাব সেন্টার থেকে স্বল্পমূল্যে দেওয়া হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির সেবা। ইউনিসেফের অর্থায়নে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি স্থাপন করেছে ১৫টি প্রাক্প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র। এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে ১৪টি মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষাকেন্দ্র। উপজেলা কৃষি অফিসের অর্থায়নে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কৃষি যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে বেকার যুব ও যুব মহিলাদের দেওয়া হয়েছে নানা প্রশিক্ষণ। বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের অধিবাসী মোজাফ্ফর হোসেন, নুর আলম, মনিরুজ্জামান ও তানিয়া বেগম জানান, চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটেছে। দাসিয়ারছড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী মোহেছেনা আক্তার মিনা বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে বিলুপ্ত ছিটমহলে গড়ে প্রতিদিন গর্ভবতী মাসহ ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছেন। চিকিত্সাসেবা পাওয়ায় বাসিন্দারা খুবই খুশি।