রেকর্ড গড়লেন শেখ হাসিনা

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:৪৩

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৭ বছরের ইতিহাসে অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পরপর তিনবার এবং এ পর্যন্ত মোট চারবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অভূতপূর্ব গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছেন তিনি। চতুর্থবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আজ সোমবার বিকালে বঙ্গভবনে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে এই অনন্য ইতিহাসের জন্ম দিতে যাচ্ছেন তিনি। বিশ্বে এমন দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই।

দক্ষ ও দূরদর্শী নেতৃত্বগুণে শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই দেশের গন্ডি পেরিয়ে স্থান করে নিয়েছেন বিশ্বনেতৃত্বের কাতারে। লক্ষ্য ঠিক করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি দেশকে যাদুমন্ত্রের মতো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দক্ষতা দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বিশ্বকে। দুনিয়ার প্রভাবশালী সব রাষ্ট্রই একবাক্যে বলছে- বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর শেখ হাসিনার অনবদ্য নেতৃত্ব মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছে উন্নত  দেশে পরিণত হওয়ার। দেশের জনগণের বিশ্বাস, আজ শপথের মাধ্যমে আবারও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে আগামী পাঁচ বছরে তিনি বদলে দেবেন বাংলাদেশকে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের প্রতিটি গ্রাম উন্নত হবে শহরে, পালাতে শুরু করবে দারিদ্র্য। শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘ভিশন-২০২১’ অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ আর ২০৪১ সালে হবে উন্নত দেশ। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা।

শেখ হাসিনা প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ১৯৯৬ সালে। ওই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথ নেন। ২০০১ সালে মেয়াদ শেষে শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তখন একটি নির্বাচিত সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারার রেকর্ডও অর্জিত হয় শেখ হাসিনার হাত ধরেই। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ওই বছরের ১২ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে চতুর্থবারের মতো আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শেখ হাসিনা। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি সরকারি ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজের ছাত্রসংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। এই কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরের বছর সভাপতিও ছিলেন। শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদস্য এবং ছাত্রলীগের রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই শেখ হাসিনা সকল গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার সময় তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার ঐতিহাসিক হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত করা হয়।

দীর্ঘ ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে শক্তহাতে হাল ধরেন দলের। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতন্ত্রের পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরে সহস্র বাধা অতিক্রম করে জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে দেশে ফেরার ১৫ বছরের মাথায় আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি।  তাকে হত্যার জন্য কমপক্ষে ১৯ বার হামলা করা হয়। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালনকালে তাকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। এতে যুবলীগ নেতা নূর হোসেন, বাবুল ও ফাত্তাহ নিহত হন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তাকেসহ তার গাড়ি ক্রেন দিয়ে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনে তাকে লক্ষ্য করে পুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় শেখ হাসিনা অক্ষত থাকলেও আওয়ামী লীগের ৩০ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচন চলাকালে তাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯৪ সালে ঈশ্বরদী রেল স্টেশনে তার কামরা লক্ষ্য করে অবিরাম গুলিবর্ষণ করা হয়। ২০০০ সালে কোটালীপাড়ায় হেলিপ্যাডে এবং শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে ৭৬ কেজি ও ৮৪ কেজি ওজনের দু’টি বোমা পুতে রাখা হয়। বিএনপি সরকারের সময় সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ঐদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে এক জনসভায় বক্তব্য শেষ করার পরপরই তাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা করা হয়। ইতিহাসের ভয়ঙ্কর ও লোমহর্ষক সেই হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ তার দলের ২২ নেতাকর্মী নিহত হন এবং ৫শ’র বেশি মানুষ আহত হন। শেখ হাসিনা নিজেও কানে আঘাত পান। 

শত বাধা-বিপত্তি এবং হত্যার হুমকিসহ নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা ভাত-ভোট এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য অবিচল থেকে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। সামাজিক কর্মকান্ড, শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য শেখ হাসিনাকে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা বহুবার পুরস্কৃত করেছে।