কবিতার শরবিদ্ধ মহাদেব

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২০, ২০:১০

একজীবন কবিতার সঙ্গেই তুমুল বসবাস। কাব্যদেবীর পেছনে নিরন্তর ছুটে চলা এক দীর্ঘ পথের পথিক কবি মহাদেব সাহা। কবির এ পথচলা কখনো কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বরং অন্তর্গত এক ক্ষরণের দহনে দগ্ধ হতে হতে নিরন্তর সৃষ্টি করেছেন বর্ণিল বর্ণভুবন। কবির স্বনির্মিত এ ভুবনে আছে প্রেম, বিরহ, যন্ত্রণা; আছে সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বচেতনার বিশদ স্বাক্ষর। মানবীয় অনুভবের সর্বব্যাপী বিস্তার তাঁর কবিতাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে, করে তুলেছে গণমানুষের হূদয়স্পর্শী।

মহাদেব সাহা কবিতাকে কবিতাই করে তুলতে চেয়েছেন। কবিতার নির্ভার শরীরকে তিনি ভারাক্রান্ত করতে চাননি। স্বকীয় অনুভূতির কাছে সত্ থেকে তিনি কবিতাকে দিয়েছেন এক সুরেলা ভাষা। সংগীতের অশ্রুত সিম্ফনি জেগে ওঠে তাঁর প্রতিটি শব্দের শিরা-উপশিরায়। তাঁর কবিতা পাঠ করতে করতে পাঠক একসময় আবিষ্কার করেন নিজস্ব অনুভবের তীব্র আলোড়ন। মানুষের অন্তর্গত দহন, অপ্রাপ্তি, প্রণয়ের তীব্র কাতরতা কিংবা শূন্যতার বোধ তাঁর কবিতায় আবেগঘন ভাষাভঙ্গি পেয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কবি যখন বলেন—কেউ জানে না একেকটি মানুষ বুকের/ মধ্যে কী গভীর দীর্ঘশ্বাস/ নিয়ে বেড়ায়।’ তখন প্রতিটি মানবহূদয়ের অন্তর্লীন অনুভব যেন ভাষাময় হয়ে ওঠে।

মহাদেব সাহার কবিতায় আত্ম-অনুভূতির এক অভূতপূর্ব উত্থান লক্ষযোগ্য। এ আত্ম-অনুভব একমাত্রিক নয়। বহুমাত্রিক বর্ণিল অনুভবের ব্যঞ্জনা তাঁর কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। প্রেম তাঁর কবিতার প্রাণপ্রবাহ। ভালোবাসার অনুভব তাঁকে কবিতায় ও জীবনে সচল রাখে নিরন্তর—‘একবার ভালোবেসে দেখো, একবার/ কাছে ডেকে দেখো/ আবার আগের মতো কীভাবে ফুটাই এক/ লক্ষ একটি গোলাপ/ অনায়াসে কীভাবে আবার অনুভূতি করি সঞ্চারিত/ একবার ভালোবেসে দেখো আবার/ কীভাবে লিখি দুহাতে কবিতা।’ প্রেমের গভীর অনুভব কবির গহিনে সঞ্চার করে কবিতার কুহকী অনুভব। কাঙ্ক্ষিতার সাহচর্যে মগ্ন কবি মুহূর্তের জন্যও তাকে দূরে যেতে দিতে রাজি নন। যখনই সে চলে যেতে উন্মুখ, কবির মনে হয়—

‘তুমি চলে যাওয়ার জন্য যখন সিঁড়ি দিয়ে

নামতে থাকো

তত্ক্ষণাত্ পৃথিবীর আরো কিছু বনাঞ্চল

উজাড় হয়ে যায়।’

চণ্ডীদাসের রাধা-কৃষ্ণ যেমন পরস্পরের সঙ্গে আত্মার বাঁধনে বাঁধা; কবির ভাষায়—‘এমন পিরিতি কভু দেখি নাই শুনি/ পরানে পরান বাঁধা আপনা আপনি।’ তেমনি মহাদেব সাহার কবিতায়ও প্রণয়ের আত্মিক স্পন্দন টের পাওয়া যায়। ‘কোনো তরুণ প্রেমিকের প্রতি’ কবিতায় তিনি বলেন—‘তরুণ প্রেমিক তুমি তো জানো না তোমার/ উতল আলুথালু প্রেম/ একদিন ছিলো আমারই আকাশে’। প্রেমের অনুভবে মহাদেব চিরতরুণের প্রতিদ্বন্দ্বী চিরকাল।

মহাদেব সাহার কবিতায় প্রকৃতি বিচিত্র জীবনবোধের জীবন্ত সঞ্জীবনী রূপে ধরা দেয়। কবির অনুভবের সমান্তরাল হয়ে প্রকৃতি নানা সময় নানা ভূমিকায় অবতীর্ণ। এ প্রকৃতি কখনো তার প্রেমের অনুভব রূপায়ণে সহায়ক, কখনো বিরহচেতনার সহচর, কখনো বা সমাজভাবনার উদ্দীপক। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট  হবে—

১. বলো না কখন ফুটবে গোলাপ গোলাপের

চেয়ে বড়ো

কখন মানুষ পাবে এই দেশে শস্যের অধিকার

২. ভালোবাসা তুমি পাখি হতে যদি

                তোমাকে রাখার ভাবনা কি ছিলো

এই নীলাকাশ তোমারই জন্য

অনায়াসে হতো অনুপম খাঁচা।

৩. বহু বছরের এই রোদ বৃষ্টিজলে ঝড়ে

কুয়াশায়

নষ্ট হয়ে গেছে প্রেম, মুখের গড়ন তার

দেহের বাঁধন

তিনটি উদাহরণে কবির তিন ধরনের ভাবনার বিস্তারে প্রকৃতির তিন রকম ভূমিকা সহজলক্ষ। প্রথম উদাহরণে মানুষের অধিকার আদায়ের প্রসঙ্গ প্রকৃতির আনুকূল্যে ভাষা পেয়েছে। দ্বিতীয়টিতে ভালোবাসার অনুভব প্রকৃতির আশ্রয়ে নীলাকাশস্পর্শী হয়ে উঠেছে। আর তৃতীয় দৃষ্টান্তে বিরহের তীব্র অনুভবে কবির প্রকৃতির প্রতি ভিন্ন অনুভবের আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সমসাময়িক সমাজ ও বিশ্বপরিস্থিতি মহাদেব সাহার কবিতায় প্রগাঢ় ছায়া ফেলে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অস্থিরতা, মুক্তির সংগ্রাম তাঁর কবিতায় সাবলীল ভাষারূপ লাভ করেছে—‘আমি যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি তখন/ পর্ণকুটিরে/ জ্বলে ওঠে আলোকশিখা/ শহীদ জননীর প্রাণ গর্বে ভরে ওঠে, চোখের জল/ মুছে ফেলে/ তখন বাংলার সবুজ প্রান্তর শস্যে ভরে যায়।’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অগ্রণী ভূমিকার প্রসঙ্গ মহাদেব সাহার কবিতায় ঘুরে ফিরে আসে। বার্লিনে একজন ভায়োলিনবাদক কবির কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। তখন—

‘আমি

আমার বুক পকেট থেকে ভাঁজ-করা

একখানি দশ

টাকার নোট বের করে শেখ মুজিবের ছবি

দেখিয়েছিলাম

বলেছিলাম, দেখো এই বাংলাদেশ’

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সামাজিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন কবিকে ব্যথিত করেছে, করেছে মর্মাহত। চারদিকে মানবিক বিপর্যয়, মূল্যবোধের অবক্ষয়, শাসকের স্বেচ্ছাচারিতায় হতবাক কবি লেখেন—‘ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উল্লাস’। এ কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতায় কবি বলেন—‘ভিতরে ফলের মতো পচে গেলো সুস্থ সম্পন্ন কল্যাণ/ ফুল নত ফসল বিব্রত পলাতক প্রসন্ন প্রকৃতি/ আরো কতো কালো হলো উহাদের বুক, কত ক্ষুণ্ন হলো পাখি’। সামরিক শাসকের অন্যায় আদেশের প্রতিবাদে তিনি লেখেন—গাছগুলি আদেশ অমান্য করে মাঝে মাঝে/ যদি তোলে ঝড়/ অতঃপর তাকেও কি দেশদ্রোহী আখ্যায়িত/ করে ফেলা হবে/ যদি তারা বাধ্যানুগতের মতো ক্ষমতাকে/ না করে কুর্নিশ’

প্রতিবাদ ভুলে যাওয়া মূঢ় তারুণ্যের স্তব্ধতায় কবি সমাজের সমূহ বিনাশের চিহ্ন খুঁজে পান। যৌবন নিজেই যেন অপরাধী হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। যেখানে সময়ের প্রয়োজনে তরুণরাই যুগে যুগে এগিয়ে এসেছে। যোগ দিয়েছে প্রতিবাদে, মিছিলে। কালের এ নিঃসাড় নেতিচেতনায় আহত কবি লেখেন—

‘তবু মনে হয় এ যুগে কোথাও কোনো স্বাধীনতা

নেই, বরং এ যুগে মানুষ যেন

পোষমানা দুর্বল মহিষ, নিজের যৌবন

আজ তার কাছে সবচেয়ে বড়ো অপরাধ, নিজের

বিবেক আজ তার সবচেয়ে

বিদগ্ধ কসাই’

সমকালীন বিশ্বপরিস্থিতি কবিকে ব্যাকুল করে। হূদয়ের গভীরে কবি অনুভব করেন গোপন রক্তক্ষরণ। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বোমা হামলায় কবি ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হন। ফিলিস্তিনি গেরিলাদের মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে কবি একাত্মতা পোষণ করেন—‘সে এখন প্যালেস্টাইনী গেরিলাদের/ কানে স্বাধীনতার গান গাইছে;/  ইসরাইলী হামলায় ক্ষতবিক্ষত লেবাননের পল্লীতে সে/ এখন ব্যস্ত উদ্ধারকর্মী, হাতে শুশ্রূষার ব্যাগ/ নিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বাহুতে ব্যান্ডেজ/ বেঁধে দিচ্ছে আমার কবিতা’।

কবিতার প্রকরণগত পরিচর্যায় মহাদেব সাহা স্বতঃস্ফূর্ত ও সাবলীল। ব্যক্তিক ও সামাজিক অভীপ্সার রূপায়ণে এবং অনুভূতির দৃশ্যমান কাঠামো তৈরিতে প্রচলিত কাব্যিক অলঙ্কারগুলোকে তিনি প্রাতিস্বিক ভঙ্গিমায় গ্রহণ করেছেন কবিতায়। যা তাঁর কবিতাকে শৈল্পিক সৌন্দর্যে মহিমান্বিত করেছে। বক্তব্যকে করেছে মনোরম ও অনুভবগ্রাহ্য। উপমা, চিত্রকল্প, রূপক, উেপ্রক্ষা, সমাসোক্তি প্রভৃতি অলঙ্কারের অভিনব প্রয়োগ তাঁর কবিতায় দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে।

১. উপমা : খণ্ড খণ্ড ইওরোপের মানচিত্রের মতো,

                    একা হয়ে যাও সব সঙ্গ থেকে, উন্মাদনা থেকে।

২. চিত্রকল্প : আমার মনে সেই বাক্যালাপগুলি নিরন্তর

      শিশির হয়ে ঝরে পড়ে

      মৌমাছি হয়ে গুণগুণ করে

      স্বর্ণচাঁপা আর গোলাপ হয়ে ঝরতে থাকে

৩. সমাসোক্তি :কোকিলও কি দেশদ্রোহী যদি সে আপন মনে কারো                                                                                             নাম ধরে ডাকে

 

ওপরের উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মহাদেব সাহার কবিতা নির্মাণের সাবলীল অথচ শৈল্পিক দক্ষতার স্বাক্ষর। মহাদেব সাহার কবিতার সবচেয়ে বড়ো গুণ সহজবোধ্যতা। তবে সহজ কবিতা লেখা প্রকৃতপক্ষে সহজ নয়। ভেতরে প্রকৃত কবিত্বের সমুদ্র না থাকলে এমন সহজ ঢঙে অনুভবস্পর্শী শব্দের জন্ম দেওয়া অসম্ভব। মহাদেব সাহা সেই কবিত্বের আশীর্বাদপ্রাপ্ত কবি, যিনি জনমনকে স্পর্শ করেও শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার জন্ম দিতে পেরেছেন। শুধু তা-ই নয়, ধারণ করতে পেরেছেন স্বদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক সচলতার ইতিবৃত্ত। বাংলা কবিতায় তাই মহাদেব সাহা এক অনিবার্য কবির নাম।