ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের জীবনরহস্য উন্মোচন

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২১:০৬

তাত্পর্যপূর্ণ আরেকটি সুখবর দিয়াছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। পাট, মহিষ ও ইলিশের পর এইবার তাহারা পৃথিবীর অন্যতম সেরা জাতের ছাগল ‘ব্ল্যাক বেঙ্গলের’ জীবনরহস্য উন্মোচন (জিনোম সিকোয়েন্সিং) করিয়াছেন। এই সাফল্য অর্জিত হইয়াছে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু পালন বিভাগের অধ্যাপক বজলুর রহমান মোল্লার নেতৃত্বে। রবিবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জৈবপ্রযুক্তিবিষয়ক সংস্থা এনসিবিআই হইতে নিবন্ধন লাভের পর গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশের এই স্থানীয় জাতের ছাগলের জীবনরহস্য উন্মোচনের ঘোষণা প্রদান করা হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। উল্লেখ্য যে, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের মাংস বিশ্বব্যাপী ‘কুষ্টিয়া গ্রেড’ নামে পরিচিত, যাহা বিশ্বের অন্যতম সেরা ছাগলের মাংস হিসাবে সমাদৃত ও স্বীকৃত। জীবনরহস্য উন্মোচনের সহিত যুক্ত বিজ্ঞানীরা বলিয়াছেন যে, তাহাদের উদ্ভাবন এই ছাগলের জাতের আরও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিবে। বিশেষ করিয়া ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের ওজন ও মাংসের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং মৃত্যুহার হ্রাসের ক্ষেত্রে এই উদ্ভাবনের ভূমিকা হইবে সুদূরপ্রসারী। প্রত্যাশিতভাবেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের দলটি পরবর্তী ধাপের গবেষণার কাজও আগাইয়া নেওয়ার কথা জানাইয়াছেন। এই উদ্ভাবনের মধ্য দিয়া কেবল যে আমাদের বিজ্ঞানীদের সাফল্যের মুকুটে নূতন একটি পালক যুক্ত হইল তাহাই নহে, জলবায়ু পরিবর্তনসহ জানা-অজানা নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সামর্থ্যেরও প্রকাশ ঘটিয়াছে।

যুগ যুগ ধরিয়া বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টি সুবিদিত। দ্রুত বর্ধিষ্ণু ও প্রজননক্ষম, পরিবেশসহিষ্ণু এবং অল্প জায়গায় পালন করা যায় বলিয়া ইহাকে ‘গরিবের গাভি’ বলা হইয়া থাকে। কিন্তু এই ছাগলের আকৃতি একটু ছোট ও মাংস কম হয়। জীবনরহস্য উন্মোচনের ফলে এখন আরও উন্নত জাত উদ্ভাবন করা সহজ হইবে। অনিবার্যভাবে ইহার ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়িবে যুগপত্ দারিদ্র্য বিমোচনে ও মাংস উত্পাদনে। জানা যায়, বাংলাদেশে মোট ছাগলের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৭৬ লাখ, যাহার ৯০ শতাংশই ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে বছরে প্রায় এক লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন ছাগলের মাংস উত্পাদিত হয়, যাহা মোট উত্পাদিত গবাদিপশুর মাংসের প্রায় ২৫ ভাগ। বস্তুত বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের অবদান আজ বিশ্বস্বীকৃত। গত পাঁচ বত্সরে ইহা তাহাদের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন। ইহার আগে ২০১৩ সালে পাটের, ২০১৪ সালে মহিষের এবং চলতি বত্সরের সেপ্টেম্বরে ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন করিয়া কৃষিক্ষেত্রে নূতন সম্ভাবনার দ্বার খুলিয়া দিয়াছেন। অবশ্য ইহা যে আকস্মিক কোনো ব্যাপার নহে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি মত্স্য ও সবজি উত্পাদনে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্যই তাহার উজ্জ্বল উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হইতে পারে। মনে রাখা আবশ্যক যে, বাংলাদেশের আবাদযোগ্য ভূমি যখন উদ্বেগজনক হারে কমিতেছে এবং জনসংখ্যা যখন দ্বিগুণেরও বেশি হইয়াছে—এমন একটি প্রেক্ষাপটে এই অর্জন এককথায় অসামান্যই বলিতে হইবে। বিপুল জনসংখ্যা, দারিদ্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। সব চাইতে বড় চ্যালেঞ্জটি নিঃসন্দেহে খাদ্য নিরাপত্তার। আমাদের মেধাবী ও নিষ্ঠাবান বিজ্ঞানীদের অর্জন নিঃসন্দেহে এই ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখিবে।