বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২১:০৭

অনেক জল্পনা-কল্পনা সংশয় ও শঙ্কাকে অতিক্রম করে ১৫০ জনের প্রথম রোহিঙ্গা দলটি বাংলাদেশ থেকে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত যাচ্ছে আজ। গত প্রায় এক বছরের অধিক সময় ধরে বিশ্ব অঙ্গনে আলোচনার শীর্ষে অবস্থান করছে রোহিঙ্গা সমস্যাটি। দুই দেশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম দফায় দুই হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যাবে। প্রতিদিন যাবে ১৫০ জন করে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে কাউকে জোর করে পাঠানো হবে না। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা ফিরে আসবে তারা ৬ মাস পর নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবে। সূত্রমতে রোহিঙ্গাদের রেজিস্ট্রেশনসহ যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্ন করতে ইতোমধ্যে নির্মিত প্রতিটি ট্রানজিট পয়েন্টে ৬২৫টি করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা থাকতে পারবে। অভ্যর্থনা কেন্দ্রে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যাবাসিত হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শিশুদের টিকা দান, গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। আজকে শুরু হওয়া প্রত্যাবাসন কাজের ধারাবাহিকতায় প্রথম পর্যায়ে আট হাজার রোহিঙ্গা ফেরত যাবে বলে জানা গেছে। কয়েকশ বছরের পুরনো এই সমস্যাটির সমাধানের পূর্ব শর্তই হচ্ছে নিরাপদে ও স্বইচ্ছায় সব রোহিঙ্গাকে নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফেরত যেতে হবে এবং মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। কথা হলো—রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এই ফেরত যাওয়া নিয়ে বহুবিধ ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত শুরু হয়ে গেছে। এই চক্রান্তের দুটি স্বরূপ দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থা এবং এনজিও এই ফিরে যাওয়ার বিরুদ্ধে কাজ করছে। এর মধ্যে ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কিছু এনজিও রয়েছে। অথচ এই ফেরত পাঠানোটা কিন্তু হঠাত্ করে হচ্ছে না। গত এক বছর ধরে বাংলাদেশ মিয়ানমার সরকারের মধ্যে সংলাপ আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের সফর বিনিময় হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে প্রত্যাবর্তন বিষয়ক একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। শুধু দুই দেশের মধ্যে নয়, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার সঙ্গেও ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমারের ক্ষমতাশালী একাধিক মন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন এবং তারা কক্সবাজারে গিয়ে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন এবং তাদেরকে নিরাপদে ফেরত নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এ কথাও ঠিক, গত বছরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে অমানবিক ও সীমাহীন নির্যাতন চালিয়েছে তাতে মিয়ানমারের ওপর বিশ্বাস রাখা কঠিন। মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনসহ গণহত্যার মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ করেছে। এর বিচার অবশ্যই হতে হবে। তবে একটার সঙ্গে আরেকটি গুলিয়ে ফেললে কোনোটাই হবে না। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। তারা সেখানে ফেরত যাওয়ার সঙ্গে বিচারের কোনো সম্পর্ক নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিচার চাইলে মিয়ানমার তা এড়াতে পারবে না। বিচারের এই চাপটি অব্যাহত রাখতে হবে। তাতে যারা ফেরত যাচ্ছে তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে মিয়ানমার আরও বেশি সতর্ক হবে। তবে ফেরত যাওয়াটাকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। এতে মিয়ানমারের সদিচ্ছারও প্রমাণ পাওয়া যাবে। আর ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গাকে তো এক-দুই ধাপে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না। সব কিছু যদি ঠিকঠাকভাবে চলে, তারপরেও সব রোহিঙ্গা ফেরত যেতে কমপক্ষে এক-দেড় বছর লেগে যাবে। গত বছর রোহিঙ্গা সংকট নতুনভাবে শুরু হওয়ার পর থেকে ইউরোপ, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু গ্রাউন্ড বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন। এই বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গা একটা যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে ফেরত না গেলে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং বিশেষ করে নিরাপত্তাসংক্রান্ত যে সংকট সৃষ্টি হবে তা সামাল দেওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত এক বছরে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো উদ্যোগই কাজে আসেনি চীনের বিরোধিতার কারণে। আগামী দিনেও একই রকম পরিস্থিতি বিরাজমান থাকবে, চীনের মতের বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না। চীন একান্তভাবেই চাচ্ছে রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়া এখনই শুরু হোক। আজ ১৫ নভেম্বর প্রথম ব্যাচ ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে চীনের প্রবল সমর্থন রয়েছে।

গত বছর সংকটের শুরু থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। জননিরাপত্তার হুমকিসহ বহুবিধ চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখেই মানবিক কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ অসহায় এই সব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, শুরু থেকে এ পর্যন্ত জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সকল উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশ একমত হয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে বিচারের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) উদ্যোগের প্রতি সমর্থন দিয়েছে এবং এ ব্যাপারে সহযোগিতা প্রদানের লিখিত আশ্বাস দিয়েছে। আবার অন্যদিকে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য, রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সংলাপ-আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। অত্যন্ত ভারসাম্যমূলক নীতি অনুসরণ করতে পেরেছে বলেই আজ রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়াটা শুরু করা সম্ভব হচ্ছে। মিয়ানমার আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। ইচ্ছা করলেই তো আমরা প্রতিবেশী বদলাতে পারছি না। বাংলাদেশ শুরু থেকে বলে আসছে— এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারণে এটি এখন আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গা বা মিয়ানমার কোনো পক্ষই বাংলাদেশের শত্রু নয়। মিয়ানমারের অপরাধের বিরুদ্ধে যেমন বাংলাদেশের মানুষ সোচ্চার হয়েছে, তেমনই রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিলেও সব সময়ই আমরা বলে আসছি রোহিঙ্গাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফেরত যেতে হবে এবং মিয়ানমারের সমস্যা মিয়ানমারকেই সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশ একথাও স্পষ্টভাবে বলেছে, এ ব্যাপারে মিয়ানমারকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত। মিয়ানমারের নিরাপত্তাজনিত যেকোনো উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ সব সময় অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। আগামীতেও সে ধারা অব্যাহত থাকবে, যেটি মিয়ানমারও এতদিনে বুঝতে পেরেছে।

এই যে প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে, তাতে বোঝা যায় মিয়ানমার তার নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের বিষয়ে বাংলাদেশের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পেরেছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিশ্ব অঙ্গনে প্রমাণ করেছে, প্রতিবেশীসহ কোনো দেশেরই সশস্ত্র বিদ্রোহী, জঙ্গি সন্ত্রাসীদের জায়গা বাংলাদেশের মাটিতে হবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে জিরো টলারেন্স। সুতরাং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনবোর্ড রেখে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারকে সম্মত করতে পারাটা এই সমস্যা সমাধানের পথে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এটাকে ভিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কেউ কি বলতে পারবেন, এই যে সমাধানের পথটা যেভাবে এগোচ্ছে, এর অন্য কোনো বিকল্প আছে। যারা এর বিরোধিতা করছেন তাদের কথা শুনে উইনস্টন চার্চিলের একটা উক্তির কথা মনে পড়ে গেল। চার্চিল তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের সম্পর্কে একবার পার্লামেন্টে বক্তৃতার সময় বলেছিলেন, “They are ready to make great sacrifices for their opinions, but they have no opinions. They are ready to die for the truth, if only they knew what the truth was”. প্যালেস্টাইন আফগানিস্তানসহ বহু দেশের শরাণার্থীরা যুগ যুগ ধরে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বহু চেষ্টা করেও এর কোনো সমাধান করতে পারেনি। বরং দীর্ঘ দিন সমস্যা জিইয়ে থাকার কারণে সেখান থেকে আরও বহু ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ভয়াবহ নিরাপত্তা সমস্যার সৃষ্টি রয়েছে। আজ বিশ্বব্যাপী যে ইসলামিষ্ট উগ্রবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর সৃষ্টি ও বিস্তার ঘটেছে, তার পিছনে প্যালেস্টাইন শরণার্থীদের অনাদিকাল ধরে মানবেতর জীবন-যাপনের বিষয়টি উদ্বুদ্ধকরণের কাজ করেছে।

আরেকটি বিষয় লক্ষ করা গেছে— জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এবং এনজিওরা, যারা এই সব শরণার্থী শিবিরে কাজ করে তাদের একটি বড় অংশ এই শরণার্থী সমস্যার স্থায়ী সমাধান কেন যেন চায় না। বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি যাতে না হয়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। এই সমস্যার শুরু থেকে বাংলাদেশের ভেতর থেকে একটা গোষ্ঠী বিশেষ ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি যারা করে তারাসহ উগ্রবাদী জঙ্গি গোষ্ঠী নানা ছদ্মবেশে কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে প্রবেশ করে বহু প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের উত্তেজিত করছে— যাতে তারা ফেরত না যায়। এই গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য বুঝতে কারো বাকি নেই। পূর্বেও এসব গোষ্ঠী ধর্মীয় ইস্যুকে সামনে আনায় সমস্যাটি ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। এই রোহিঙ্গা ইস্যুকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে ওই চক্রান্তকারীরা বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকেও ভণ্ডুল করার চেষ্টা করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। সুতরাং এই সব দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীর কথায় কান দেওয়া যাবে না। আজ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার যে শুভ সূচনা হচ্ছে, তা যেন অব্যাহত থাকে সে প্রচেষ্টাই সকলকে করতে হবে।

n লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক