আর কত নামবে চামড়ার দাম

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২০, ২০:৪৪

দায়িত্বহীনতায় বিপর্যয়ে পড়তে পারে এ শিল্প

রিয়াদ হোসেন

 

গত বছর কোরবানির চামড়া নিয়ে রীতিমতো তেলেসমাতি কাণ্ড ঘটে গেল। ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়েছিল চামড়ার মূল সুবিধাভোগী গরিব, অসহায় মানুষ, এতিমখানাসহ এজাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। কেবল তারাই নয়, চামড়া কিনে ট্যানারিতে দাম পায়নি ফড়িয়া, ব্যাপারী এমনকি আড়তদাররাও। ফলে দেশব্যাপী চামড়া ফেলে দেওয়া কিংবা পুঁতে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। এরপর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পর এ বিষয়ে বেশকিছু উদ্যোগের কথা শোনা যায় সরকারের তরফে। মানুষের প্রত্যাশা ছিল, গতবারের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার পরবর্তী বছরের (এবার) কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয়-বিক্রয়সংক্রান্ত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হলো না। ফলে এবার গতবারের চেয়েও চামড়ার দামে বাজে পরিস্থিতি দেখতে হলো। এক দশক আগেও যে গরুর চামড়া বিক্রি হতো ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, এবার তা বিক্রি হলো মাত্র ১০০ টাকা। কোথাও কোথাও তাও পাওয়া যায়নি। যদিও ঢাকাসহ কিছু এলাকায় একই মানের চামড়া ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্তও বিক্রি হয়েছে। তবে সেই সংখ্যা একেবারেই কম। মানুষের প্রশ্ন, আর কত নামবে দাম। অনেক জায়গায় ক্রেতাই পাওয়া যায়নি। বলা চলে প্রকৃত উপকারভোগীদের হাতে এবার চামড়ার টাকা যায়নি।

সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন, সবকিছুর দাম বাড়ছে। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেন?  শুধু তাই নয়, চামড়াজাত পণ্যের দামও তো কমছে না। বরং এক দশকের ব্যবধানে চামড়াজাত পণ্যের দাম অন্তত দ্বিগুণ হয়েছে, অথচ চামড়ার দাম তলানিতে। তাহলে গলদ কোথায়? চামড়া পচনশীল, সময়মতো ও সঠিক উপায়ে তা সংরক্ষণ করতে না পারলে গুণগত মান নষ্ট হয়। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় চামড়ার দাম যে হারে নেমে এসেছে, তাতে ভবিষ্যতে মানুষ চামড়া সংরক্ষণ করতে আগ্রহী হবে না। ফলে এ চামড়া শিল্পের কাঁচামাল না পাওয়া গেলে শিল্প বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। আমদানিনির্ভর হতে হবে। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কাঁচামাল দিয়েই প্রতিযোগিতায় টিকতে হিমশিম খাচ্ছে, আমদানিকৃত কাঁচামালে তা আরো অনেক কঠিন হবে। টিকতে না পেরে এ শিল্প থেকে উদ্যোক্তারা হারিয়ে যেতে পারে। শিল্পও ধীরে ধীরে বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

তাহলে এ শিল্পকে রক্ষায় কী করা যায়? গত বছর তিনটি বিষয় মোটাদাগে উঠে এসেছিল। চামড়ার সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করা। শুরুতে স্থানীয় কোরবানিদাতা কিংবা এতিমখানা বা এজাতীয় উত্স থেকে স্থানীয় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ করে। তাদের কাছ থেকে ফড়িয়া বা ব্যাপারীদের হাত হয়ে তা আসে আড়তদারদের হাতে। এই সময়ের মধ্যে চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ দিতে হয়। আড়তদারদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে যায় ট্যানারি মালিকদের হাতে। প্রতি বছরই শোনা যায়, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা না পেয়ে আড়তদারদের চামড়া কিনতে সমস্যা হচ্ছে। এই সমস্যা চলে যায় স্থানীয় পর্যায়ে। এই সরবরাহ চেইন ঠিক করতে হলে লেনদেনের ঝামেলা মিটানোর পাশাপাশি সংগ্রহ প্রক্রিয়ার ব্যয় কমাতে হবে। গতবার বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তা রয়ে গেছে।

চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি ঘুরে ফিরে আসছে। ট্যানারি মালিকসহ সিন্ডিকেট যাতে চামড়ার দরে প্রভাব ফেলতে না পারে, সেজন্য কাঁচা চামড়া রপ্তানির দরজা খোলা রাখা। গতবার এ সুযোগ না থাকায় মানুষ ঠকেছে। এরপর বিশেষজ্ঞদের মতামত ছিল, এ বিষয়ে আগেভাগেই সিদ্ধান্ত দেওয়া। কিন্তু ঈদের তিন-চার দিন আগে পরিস্থিতি বিবেচনায় রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। কিন্তু এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অংশ হওয়ায় এজন্য সময়ের প্রয়োজন হয়। হুট করে সিদ্ধান্ত দিলে বাস্তবে ট্যানারি মালিক ছাড়া অন্যদের পক্ষে তা সম্ভব নয়। ফলে আড়তদারসহ অন্যদের পক্ষে এই সুবিধা ধরা সম্ভব নয়। তা যাবে ট্যানারি মালিকদের পকেটে। অথচ চেষ্টা হলো ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট ভাঙা। অর্থাত্ উদ্দেশ্য সফল হবে না।

গত প্রায় দুই দশক ধরে চেষ্টা করেও চামড়াশিল্পকে পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব হয়নি। হাজারীবাগ থেকে পাঁচ বছর আগে ট্যানারিগুলোকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে সরিয়ে নিলেও সেখানে বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) ব্যবস্থা এখনো বিশ্বমানের হয়নি। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাওয়া যায়নি এখনো। ফলে ইউরোপ আমেরিকার ভালো ক্রেতার কাছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে রপ্তানির জন্য তাকিয়ে থাকতে হয় চীনের দিকে। বহুবার এজন্য সময় নিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা বিসিক। সর্বশেষ গত জুনের মধ্যে ঠিক হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এর ফলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানি। সমন্বয় ও আন্তরিকতার ঘাটতির কারণে এসব সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। ফলে বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়ে গেছে এ খাতটি।

উলটো দিনে রপ্তানিও কমতির দিকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ছিল ১২৩ কোটি ডলারেরও বেশি। ২০১৭-১৮তে তা নেমে আসে ১০৮ কোটি ডলারে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০২ কোটি আর সদ্যসমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮০ কোটি ডলারেরও নিচে। অথচ ২০১৭ সালে এই পণ্যকে প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার ঘোষণার সময় ৫ বছরের মধ্যে ৫০০ কোটি ডলার রপ্তাানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। সাম্প্রতিক করোনায় অন্য পণ্যের মতো চামড়া রপ্তানি আরো সংকটে পড়েছে।

এ খাতে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। কাঁচা চামড়ার সংগ্রহ থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে শৃঙ্খলায় আনা সময়ের দাবি। এ খাতের সমস্যাগুলো প্রায় চিহ্নিত হয়ে আছে। এখন দ্রুত সমাধানের পালা। সমাধানে যত দেরি হবে, ততই বিপুল সম্ভাবনার এই খাত হাত ফসকে বেরিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ থেকে।