যিনি তাঁর কীর্তির চেয়েও বড়

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২১:০৮

রণদা প্রসাদ সাহাকে বিভিন্ন মানুষ নানা ধরনের বিশেষণে ভূষিত করে থাকেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি দানবীর হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছেন। তিনি অকাতরে দান করেছেন স্বোপার্জিত অর্থ। রণদা প্রসাদের সুদীর্ঘ কর্মময় জীবন, তাঁর নীতি-আদর্শ, তাঁর অপার মানবিকতা এবং তাঁর সমাজচেতনা, দেশপ্রেমের কথা স্মরণ করে বলা যায়, আজকের যুগেও তিনি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

আমি শ্রদ্ধেয় রণদাপ্রসাদ সাহাকে কখনো চোখে দেখিনি। কর্মসূত্রে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী ভারতেশ্বরী  হোমসে যখন এলাম তখন অন্তর থেকে উপলব্ধি করতে লাগলাম—একটি বিশ্বাস ও ভালোবাসার নাম রণদা প্রসাদ সাহা!

সেই বিশ্বাস ও ভালোবাসার ছায়ায় আশ্রয় আছে, আছে স্নেহের পরশ। দৃশ্যত তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলো জানান দেয়—তিনি আছেন। কুমুদিনীতে এলে ঘুচে যায় মনের অনেক দৈন্য, অনেক বৈকল্য। রণদা প্রসাদের ব্যক্তিত্ব, কৃতি এবং কীর্তির পরিচয় বিষয়ে যত অনুসন্ধান করা যাবে ততই তাঁর সম্পর্কে আমাদের ধারণা নবায়িত হবে। তিনি তাঁর কীর্তির চেয়েও অনেক বড়।

রণদা প্রসাদের জীবন শুরু হয় জীবনযুদ্ধ দিয়ে। কিশোর বয়সে সে যুদ্ধ ছিল অতিশয় নির্মম। মায়ের অকাল মৃত্যুর পর নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ছেলে হয়ে পড়েন আশ্রয়হীন, ঠিকানাহীন । বাবার অবহেলা, সত্মায়ের যন্ত্রণা, আত্মীয়স্বজনের স্নেহহীন দৃষ্টি তাকে বহেমিয়ান করে তোলে। লেখাপড়া হলো না। বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে গেলেন সুদূর কলকাতায়। কষ্টসহিষ্ণুতা, সাহস ও কর্মনিষ্ঠাই ছিল পুঁজি। এসব নিয়েই এগিয়েছেন ।

জীবনযুদ্ধ থেকে পৃথিবীর প্রথম মহাযুদ্ধে। সেখানেও অকুতভয় বীরের পরিচয় দিলেন। যুদ্ধ শেষে রেলওয়ে বিভাগের সামান্য চাকরি। সে চাকরিও ছাড়তে হলো কোনো এক চক্রান্তে পড়ে। কিন্তু চাকরি ছাড়ার দরুন সরকারের কাছ থেকে পেলেন কিছু ক্ষতিপূরণ। সেই সামান্য পুঁজি সম্বল করে শুরু করলেন ব্যবসা। প্রথমে বাড়ি বাড়ি, পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, এরপর জাহাজে কয়লা সরবরাহ করতে লাগলেন। এর পরের গল্প কেবলই সাফল্যের। প্রতিটি পদক্ষেপে ঝুঁকি ছিল। ব্যর্থ হলে সে গল্প ইতিহাস হতো না, আমরাও শুনতে চাইতাম না।

নারায়ণগঞ্জে রণদা প্রসাদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, উপার্জনের ক্ষেত্র। আর খরচ করেছেন মির্জাপুরে— সেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তাঁর জীবনের ছন্দ ছিল এই রকম। সে ছন্দে কখনো বাধা পড়েনি। রণদা প্রসাদের শিক্ষা ও সেবামূলক দর্শনের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি খুবই প্রণিধানযোগ্য। কালান্তর গ্রন্থের ‘লোকহিত’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—‘আমরা পরের উপকার করিব মনে করিলেই উপকার করিতে পারি না। উপকার করিবার অধিকার থাকা চাই। যে বড় সে ছোটোর অপকার অতি সহজেই করিতে পারে, কিন্তু ছোটোর উপকার করিতে হইলে কেবল বড় হইলে চলিবে না—ছোটো হইতে হইবে, ছোটোর সমান হইতে হইবে। মানুষ কোনদিন কোন যথার্থ হিতকে ভিক্ষারূপে গ্রহণ করিবে না, ঋণরূপেও না, কেবল মাত্র প্রাপ্য বলিয়াই গ্রহণ করিতে পরিবে।’

রণদা প্রসাদ মানুষকে যা দিয়েছেন, তা ভিক্ষারূপে দেননি, ঋণ হিসেবেও দেননি, দিয়েছেন তাদের প্রাপ্য হিসেবে। বিশ্বাস করতেন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’। নিজের উপার্জিত অর্থ যখন সর্বসাধারণের জন্য কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে দান করেছেন তখন কোনো আত্মগরিমা তাঁকে স্পর্শ করেনি। একদিন যে অমানবিক সমাজ রনদা প্রসাদের মা কুমুদিনীর জীবন অকালে কেড়ে নিয়েছিল সেই নিষ্ঠুর বর্বর সমাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন আজীবন। বিনা পয়সায় তৃণমূল মানুষের কাছে চিকিত্সা সেবা ও মেয়েদের জন্য শিক্ষা পৌঁছে দিয়েছেন। বাস্তবে এ যুদ্ধ ছিল তাঁর জীবনযুদ্ধের চাইতেও কঠিন। যে সমাজ সংসার থেকে তিনি একদিন উচ্ছেদ হয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠিত হবার পর সেই সমাজেই ফিরে এসেছিলেন। সমাজ পারলে তাকে একঘরে করে ছাড়ত। বিদেশ যাওয়া, অখাদ্য কুখাদ্য খাওয়ার অজুহাতে রণদা প্রসাদকে ফিরে যেতে হতো আরো নিষ্ঠুরভাবে, যদি না তাঁর অর্থের জোর থাকত, না থাকত প্রভাবশালী আত্মীয়ের সমর্থন। সংবেদনশীল রণদা সেই অর্থ-সম্পদ ও সমর্থন নিয়ে সমাজের বিরুদ্ধে একরকম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন বড় শহরগুলো থেকে প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মির্জাপুরের মতো এক গণ্ডগ্রামে মা কুমুদিনীর নামে দাতব্য চিকিত্সালয় ও একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে। ত্রিশের দশকেই বিনাখরচে মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে দিতে ভারতেশ্বরী হোমস, টাঙ্গাইলে কুমুদিনী মহিলা ডিগ্রি কলেজ করলেন।

রণদা প্রসাদ বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন আরো একটি জায়গায়। গ্রামের অবহেলিত, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কুমুদিনী হাসপাতালে নার্স হিসেবে নিয়োগ দিতেন। সমাজপতিরা যাদের মানুষ বলেই গণ্য করতেন না সেইসব মেয়েদের তিনি দিয়েছিলেন জীবনকে চিনে নেবার পথ। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বাদ ও নারীর ক্ষমতায়নের সূত্র। তাঁর সংবেদনশীল মনের পরিচয় পাই আরও একটি জায়গায়। কৈশোরে যে সত্মায়ের বৈরী আচরণে তিনি বাড়িছাড়া হয়েছিলেন পরবর্তী জীবনে তাঁর ভেতরেই তিনি একজন বঞ্চিতা নারীর মুখছবি দেখেছিলেন। রণদা প্রসাদ জানতেন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থান কতটা শোচনীয়। ক্ষমাসুন্দর  দৃষ্টিতে সেই মায়ের জন্য মনের মধ্যে জায়গা করে দিয়েছেন সম্মানের উচ্চ স্থান।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ৭ মে তিনি পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে অপহূত হন পুত্রসহ। তারপর তাঁদের আর খোঁজ মেলেনি। যুদ্ধের শুরুতেই স্বজনেরা পালিয়ে যাবার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তো পালিয়ে যাবার মানুষ ছিলেন না। তিনি সকলকে নিয়েই বাঁচতে চেয়েছিলেন। সারা জীবনের সাহসী সংগ্রামী মানুষটি এখানে এসেই গুপ্তঘাতকদের হাতে পরাজিত হয়েছেন। কিন্তু বরণ করেছেন বীরের মৃত্যু। মৃত্যুতে তিনি শেষ হয়ে যাননি, রণদা প্রসাদের কর্মময় জীবন, নীতি ও আদর্শ, অপার মানবিকতা, তাঁর সমাজ চেতনা, দেশপ্রেম আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। আজ তার জন্মতিথি। জন্মতিথিতে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

n লেখক : শিক্ষক, ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর, টাঙ্গাইল

[email protected]