ওয়াশিংটন-বেইজিং ঠান্ডা লড়াই

বাণিজ্য ছাপিয়ে প্রযুক্তিতে

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২০, ২১:১০

চীন-মার্কিন লড়াইয়ে সর্বশেষ যুদ্ধাস্ত্র হয়ে উঠেছে অ্যাপ। ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই বড় বড় টেক ফার্মগুলোকে চীনের সঙ্গে ব্যবসা করার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে। চীনা সামাজিক যোগাযোগ অ্যাপ টিকটক ও উইচ্যাটের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৬ আগস্ট রাতে তিনি এ সম্পর্কিত দুটি নির্বাহী আদেশে সই করেন।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত কয়েক মাসে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটেছে। দুই দেশই বড় শহরগুলোতে একে অন্যের কনস্যুলেট বন্ধ করে দিয়েছে। বছরের গোড়ার দিকে করোনা ভাইরাসের বিস্তারের ফলে বিশ্ব জুড়ে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে। কিন্তু এই মহামারি দুই দেশকে কাছে আনার পরিবর্তে আরো দূরে ঠেলেছে। ট্রাম্প একে বারবার চাইনিজ ভাইরাস আখ্যা দিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে চীনের দাবি এই ভাইরাসের জন্য মার্কিন গবেষকরাই দায়ী। ট্রাম্প যে টিকটক এবং উইচ্যাট অ্যাপ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেবেন সেটি অনেকটা প্রত্যাশিত ছিল। ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার অ্যাক্টের আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপ নেয়। অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীর সংখ্যা এত বেশি যে, এগুলো কার্যকরভাবে বন্ধ করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

টিকটক একটি সুবিধাজনক ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ। এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে এটি অংশত মার্কিন সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফটের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। টিকটকের মালিকানা চীনের হলেও চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে এর সিস্টেম আলাদা। মার্কিন অংশটি মাইক্রোসফটের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে উইচ্যাটের পরিস্থিতি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে এটি একই সিস্টেমে চলে। চীনে উইচ্যাটের রমরমা অবস্থা। সেখানে এটি সামান্য একটি চ্যাট প্রোগ্রাম হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এটি ক্রমাগত নিজের ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ভেনমো, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার ও উবারের মতো সব যোগাযোগ সাইট একটি প্ল্যাটফরমে এনেছে উইচ্যাট। বর্তমানে চীনে মোবাইলে আর্থিক লেনদেনের ৮৩ ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহূত হচ্ছে উইচ্যাটপে। প্রতিদ্বন্দ্বী আলিপে’কেও এটি ছাড়িয়ে যেতে বসেছে। করোনাকালে চীনে এর ব্যবহার আরো বেড়েছে। দেশটির ৪০ কোটি মানুষ এখন নেট সুবিধার বাইরে। কিন্তু মোবাইলে তাদের নগদ লেনদেন এমনকি আইডিও সহজে ট্র্যাক করা যাচ্ছে না। চীনের বাইরে উইচ্যাট অবশ্য অতটা ব্যবসা সফল নয়। চীনে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২০ কোটি। উইচ্যাট অ্যাপটি অনেকটা হোয়াটসঅ্যাপের মতো। চীনে বিদেশি সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো প্রায় কোনঠাসা। সেজন্য দেশের মধ্যে এবং বাইরে চীনা পল্লিগুলোতে অ্যাপটির প্রচুর কদর।

ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রশাসন চীনসহ অনেক দেশের বিরুদ্ধে সময় সময় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের সফলতা সব সময় স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়নি। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে এটি স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, উইচ্যাটের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন বন্ধ করা এর উদ্দেশ্য। চীন ভিত্তিক গেমিং কোম্পানি টেনসেন্টের ব্যবসার ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি। বৈশ্বিক গেমিং বাণিজ্যের ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে টেনসেন্ট। ট্রাম্পের নির্দেশের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে অ্যাপল ও গুগলের ওপর। কারণ তাদের স্টোরগুলো থেকে টিকটক ও উইচ্যাট অ্যাপগুলো সরিয়ে নিতে হবে। সমস্যায় পড়বে ব্যবহারকারীরা। তারা তখন বাধ্য হয়ে অন্যদেশের টেক প্রতিষ্ঠান থেকে অ্যাপগুলো নেবে। অ্যাপল প্রতিমাসে চীনে ৩০ লাখের বেশি আইফোন বিক্রি করে। যুক্তরাষ্ট্রের পর এটি তাদের বৃহত্তম বাজার। চীনের সাধারণ মানুষের দরকার আইফোন কারণ তার উইচ্যাট ব্যবহার করবে। নিজেদের দেশে তৈরি ফোন ব্যবহার করলে আইডি গোপন করা সম্ভব নয়। এখন অ্যাপল যদি তাদের স্টোর থেকে উইচ্যাট সরিয়ে নেয় তখন চীনের ক্রেতারা কেন আইফোন কিনবে। একই কথা হংকংয়ের বেলায়ও প্রযোজ্য।

ট্রাম্প প্রশাসন যে কারণ দেখিয়ে টিকটক ও উইচ্যাট বন্ধ করেছে তা হলো এই অ্যাপগুলো স্পাইওয়্যার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। একই কথা কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ফেসবুকের বেলায়ও খাটে। চীন এ বিষয়ে কি পদক্ষেপ নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।