ফ্যাশন, সব যেন শুধু মেয়েদের জন্যই! সেই সময়টায় অনেকেই মনে করতেন, ছেলেদের আবার ফ্যাশন কী! পুরুষ থাকবে এইসব সাজানো-গোছানো শিল্পরূপের সুন্দর ছোঁয়া থেকে দূরে। ছেলেরা যাই পরিধান করুক না কেন, তাতে কী বা আসে যায়? কিন্তু আশির দশকের গোড়াতে এসে আমাদের দেশে ছেলেদের সেই ধারণা বদলাতে শুরু করে। পুরুষের ফরমাল ফ্যাশন নিয়ে এবারের আয়োজন
৮০-এর দশকের দিকে বিদেশি পোশাকের দৌরাত্ম্যের ভিতর এলিফেন্ট রোডে প্রথমবার ট্যাগ ও লেবেলে ক্যাটস আই যুক্ত করে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ বাক্যটি। পুরুষের ফ্যাশনে ফরমাল আবহ দিতে শুরু থেকেই ক্যাটস আই ছিল কাণ্ডারির ভূমিকায়। তখন সদ্য চাকরিতে আসা চাকুরে থেকে অফিসের বড় কর্মকর্তা সবারই কর্মজীবনের শুরুটায় ক্যাটস আইয়ের ফরমাল পোশাকের প্রতি ছিল বাড়তি আগ্রহ। এভাবেই ক্রেতা-আগ্রহ থেকে ক্যাটস আই বৈচিত্র্য আনতে থাকে পুরুষের ফরমাল পোশাকে।
ফরমাল ড্রেস আপ!
আধুনিকতার সঙ্গে ফ্যাশনের সরাসরি সম্পর্ক আছে। তাই ফ্যাশন পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে পোশাকেও। আর সে কারণেই দশক বা শতাব্দীর বিভাজনে পোশাকে এসেছে বৈচিত্র্য। মূলত নিজেকে পরিপাট রাখার জন্য পছন্দসই ও সমকালীন ট্রেন্ড-নির্ভর পোশাক চাই। বলা যায়, এসব ফরমাল ড্রেসআপ অফিসিয়াল পোশাক হলেও এটি এখন দৈনন্দিন পোশাকের রূপ নিয়েছে।
দিনে বা রাতে যখনই হোক, আউটফিটের পরিবর্তন দরকার সময় অনুযায়ী। এই ধরুন ফরমাল শার্ট, যেকোনো ফরমাল প্যান্টের বা টুইল চিনোস সঙ্গে টাক ইন করে পরলে সবার মাঝে স্ট্যান্ড আউট করাটা সহজ হবে। একই সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যও নিশ্চিত হয়ে যায়। অনুষঙ্গ হিসেবে অবশ্যই ভালো ব্র্যান্ডের ঘড়ি ও বেল্ট থাকা চাই।
আমি মনে করি, ফ্যাশন সব সময়ই ওভাররেটেড। আমার কাছে এটি পোশাকের মাধ্যমে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশের আর্ট। এই প্রকাশভঙ্গিও গুরুত্ব হয়তো সবাই বুঝবে না। আশি থেকে দু হাজার পরবর্তী সময়কার মিলেনিয়াল ফ্যাশন আমাদের শিখিয়েছে, কীভাবে নিজের স্টাইল স্টেটমেন্ট তৈরি করতে হয়। শুধু ব্র্যান্ডের সুন্দর কিছু পোশাক গায়ে জড়ালেই ফ্যাশন সচেতন হওয়া যায় না। পরিপাট পৌরুষ্যের জন্য প্রয়োজন নিজের ব্যক্তিত্ব আর অভিব্যক্তির সঠিক প্রকাশ ও পোশাকের বিন্যাস।
শার্টটা চাই ট্রেন্ডি ও সঠিক মাপের
প্রতিবছরই নতুন ট্রেন্ড যুক্ত হচ্ছে ফ্যাশন স্টেটমেন্টে। যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ওয়ারড্রোবেও আনতে হয় নানা পরিবর্তন। এ ক্ষেত্রে মৌসুম যা-ই হোক না কেন, দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় পুরুষের জন্য সবসময়ই ফ্যাশনে ‘ইন’ ফুল স্লিভ বা হাফ স্লিভ শার্ট। আদতে পরিচিত শার্টগুলোই রং, নকশা আর কাটের পরিবর্তনে পাচ্ছে নতুন নতুন চেহারা। গতানুগতিক সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তনেই একই চেহারার শার্টের ক্যানভাস পাচ্ছে আধুনিকতার ছোঁয়া। তাই বলা যায়, লাইফস্টাইলে ট্রেন্ডি থাকতে নতুন ডিজাইন বা কাটের শার্ট ছাড়া যেন আপনার ওয়ারড্রোব ম্যাড়মেড়াই!
বডি ফিটিং শার্ট এ সময়ের পুরুষদের পছন্দের শীর্ষে। তাই এই বডি ফিটিং শার্টের ফ্যাশনে নতুন করে যোগ হচ্ছে নানা রকম রঙের ব্যবহারে। দিনে বা রাতের নৈশ পার্টির উপযোগী বডি ফিটিং শার্ট অনেক ফ্যাশন সচেতন পুরুষের কাছে দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। শার্টের পিছনে লকার লুপ, ফ্যাগ ট্যাগ বা ফ্রুট লুপও ব্যবহার হচ্ছে ফ্যাশন ও ফিটিংস অনুসরণ করে। তাই তো নতুন কাপড় কেনার সময় ট্রায়াল দিয়ে দেখার প্রচলন বাড়ছে। আর ট্রায়ালে প্রাথমিকভাবে পোশাকের ফিটিং ও ম্যাচিংয়ের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। শার্টের ফিটের ক্ষেত্রে আরাম এবং দৈর্ঘ্যে মানানসই কি না তা জানা জরুরি। কলার ও স্লিভের দৈর্ঘ্য ঠিক আছে কি না, দেখতে হবে তা-ও। পাশাপাশি দেখা চাই শোল্ডার ফিট, কাফ-এর ফিট এবং শার্টটি শরীরে সুন্দরভাবে আঁটসাঁট কি না। শার্টে বোতাম লাগানোর জন্য বিপরীত রঙের সুতারও ব্যবহারও দেখা যাচ্ছে গেল বছর থেকে। শার্টে স্ট্রেট কাট থাকলেও পকেটের আশপাশে পিনটাকস, পিছনে কুঁচি থাকছে এখনকার ফ্যাশনে। তবে বুক পকেট ছাড়া শার্টের ফ্যাশন এখনো অনেক জনপ্রিয়। শার্টের কলারের মাপের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম হলো ইঞ্চির মাপ। সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ ইঞ্চি পর্যন্ত কলারের মাপ হয়ে থাকে। শার্ট কেনার সময় তাই ইঞ্চিতে, নাকি সেন্টিমিটারে, তা জেনে নিতে হবে। সাধারণত রেগুলার, মিডফিট বা সেমি স্লিম ও স্লিমফিট মাপের শার্টই ক্রেতারা খুঁজে থাকেন।
শার্ট কলার-কাফে অনেক পদ
শার্টের জনপ্রিয় কলারের কাটের মধ্যে বান কলার, পিন কলার, ট্যাব কলার, বাটন ডাউন কলার, অ্যাস্প্রেড কলার, কাটওয়ে কলার বেশি ব্যবহার হয়। জনপ্রিয় আরও কিছু কলার হলো আইলেট, উইনগস, ম্যান্ডারেন, স্মল উইনগস বা স্ট্যান্ডিং।
তবে, ফরমাল শার্টের কলার অ্যাস্প্রেড কলার হয়ে থাকে এবং এটি টাই ছাড়া কখনোই পরা ঠিক নয়। সাধারণত ব্যবসায়িক মিটিং কিংবা ফরমাল কোনো নিমন্ত্রণের জন্য মানানসই বেশি। তবে অফিসের কাজে বাইরে গেলে বিজনেস ক্যাজুয়াল চলতে পারে। এদিকে
কাফের ক্ষেত্রে ফ্রেন্স কাফ, কনভার্টেবল স্কয়ার কাফ, এক বোতামের মিটার্ড কাফ বেশ জনপ্রিয়। ইদানীংকার এদেশের রেডি টু ওয়ার ব্র্যান্ডগুলোর প্রিমিয়াম কোয়ালিটির শার্টগুলোতে ফেব্রিক টেক্সচার ও ড্রেপিং নিয়ে এক্সপেরিমেন্টও হচ্ছে বেশ। এদিকে শার্টের কাট কাফলিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সেটা দেখেই কিনুন। বাইন্ড, ট্রায়াঙ্গল, চারকোনা, ওভাল, কয়েনশেপের কাফলিং প্রচলিত রয়েছে এখনো।
যুতসই চাই টাই
চিকন টাইয়ের চেয়ে মোটা টাই তুলনামূলক বেশি ফরমাল লুক এনে দেয়। তবে শারীরিক আকৃতির সঙ্গে টাইয়ের আকৃতি মানানসই হতে হবে। সাধারণত ফরমাল টাইগুলো প্রস্থে দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি হয়। বিভিন্ন রকমের টাই রয়েছে। এর মধ্যে নেক টাই, এস্কট টাই, বো টাই, বোলো টাই অন্যতম। টাইয়ের জনপ্রিয় বাঁধার ধরনের মধ্যে ফোর ইন হ্যান্ড নট, হাফ উইন্ডসর নট, ফুল উইন্ডসর নট, বো স্টাইল, ক্যাফে নট, এলদ্রেজ নট, ট্রিনিটি নট উল্লেখযোগ্য। তবে ক্ল্যাসিক ফ্যাশনে বো টাই অভিজাত্যের প্রতীক।
বটমে প্যাটার্ন বৈচিত্র্য
ফেব্রিক বৈচিত্র্য থেকে প্যাটার্ন বা ডিজাইন এখন সবকিছুতে কনটেম্পরারি টুইস্ট দিতে যেন উত্সাহী ফ্যাশন ট্রেন্ডের প্রতিনিধিরা। ছেলেদের ফ্যাশনে ট্রাউজারসে তাই নিরীক্ষা এখন প্যাটার্ন, প্রিন্ট আর কাপড়ের ম্যাটেরিয়ালে। তবে আমাদের দেশে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো চিনোস বা ফরমাল নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী কাজ করছে যা মূলত প্যাটার্ন-নির্ভর। তবে ট্রাউজার হালকা না গাঢ় রঙের হবে তা নির্ভর করবে সামগ্রিক আউটফিট এবং পরিবেশের ওপর।
অভিজাত পকেট স্কয়ার
কোট বা স্যুটের পকেটে বিভিন্ন স্টাইলে বিভিন্ন আকার ও বিভিন্ন ভাঁজে রাখা যে রুমাল সদৃশ কাপড় চোখে পড়ে, তাই পকেট স্কয়ার। পকেট স্কয়ার সবসময়ই টাই হতে ভিন্ন হওয়া চাই। বিভিন্ন উজ্জ্বল এবং গাঢ় রঙের মিশেলে সুন্দর নকশা কাটা ডিজাইনের পকেট স্কয়ার এখন ফ্যাশনে ইন। ফ্লোরাল পকেট স্কয়ার, পেইসলি পকেট স্কয়ার, বার্গান্ডি পোলকা ডট পকেট স্কয়ার, লিনেন পকেট স্কয়ার, এক রঙের ছাপা কাপড়ের পকেট স্কয়ার এখন বেশ জনপ্রিয়।
বাদ যাবে না ফ্যাশন অনুষঙ্গও
ভালো পোশাকের সঙ্গে যুতসই ফ্যাশন অনুষঙ্গও চাই। জুতার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে বেল্ট কেনাটাই ভালো। এতে কন্ট্রাস্ট ভালো হয়। সাধারণত কালো এবং খয়েরি রঙের জুতা ও বেল্টে ছেলেদের বেশি মানায়। আর একটি কথা, যত নতুন মডেলের স্মার্টফোনই ব্যবহার করেন না কেন হাতে কিন্তু ঘড়ি মাস্ট! তবে জুতা পরুন পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে। লোফার, ব্রগ, মঙ্ক-স্ট্র্যাপস, অক্সফোর্ড বা ডার্বি জুতাতেই অভিজাত পুরুষ হয়ে উঠে ক্লাসিক। তবে ইদানীং জুতাতে রঙিন মোজা পরার প্রবণতা আধুনিক তরুণদের মাঝে বেশ বেড়েছে।
লেখক : ডিজাইনার ও
পরিচালক, ক্যাটস আই
মডেল তামিম ইকবাল
পোশাক ক্যাটস আই
ছবি রিয়াদ আশরাফ
