অস্ট্রেলিয়ার পথে আমকান্ড

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২০, ২০:০২

পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও কুকুরের হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেল না। যে কারণে শেষ রক্ষাও হলো না। ইমিগ্রেশন সব পার করে এসেছি। বেল্ট কনভেয়র থেকে ব্যাগ নিয়ে কাঁধে ঝুলিয়েছি সবেমাত্রই। একটি কুকুর বারবার আমার ব্যাগে কামড় দেওয়ার চেষ্টা করছে। সেটা দেখে ইমিগ্রেশন পুলিশ চটজলদি চলে এলো। ব্যাগ খুলতে বললেন। খুললাম; জামা কাপড়ের সঙ্গে বেড়িয়ে এলো বেশ বড় সাইজের দুটি পাকা আম। আর যায় কোথায়! সাথে সাথে ১০০ ডলার ফাইন। ৭ দিনের অস্ট্রেলিয়া ট্যুরের হাতখরচা বাবদ সব মিলিয়ে প্রফেসর দিয়েছেন ২০০ ডলার। ১০০ ডলার এখানেই চলে গেলো, এই ক’দিন চলবো কী করে?

কুকুরটাও খুব দুষ্টু। আম কি শুধু আমি একা নিয়ে এসেছি? আমার সঙ্গী দুজন কোরিয়ান মেয়ে তারাও তো একই কাজ করেছে। কই, তাদের ব্যাগে তো হানা দিতে পারছিস না? নাকি মেয়েদের ব্যাগে হাত দিতে নেই?

ফাইন তো মাফ করাতেই হবে। কী করা যায়? বারবার বলছি—নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আমার ঠিক জানা ছিল না। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বন্ধুর জন্য আম দুটি নিয়ে যাচ্ছি। আমি নেহাতই কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য আপনাদের দেশে এসেছি। কে শোনে কার কথা? কিছুতেই কনভিন্স করা যাচ্ছে না। অবশেষে শেষ অস্ত্রটি প্রয়োগ করলাম। এবার কাজ হলো। বললাম, শুধু আমি কেন, আমার সঙ্গী দুজনই যে একই কাজ করেছে। তাদের ব্যাগেও দুটি করে আম রয়েছে। তাদের টনক নড়লো। সঙ্গে সঙ্গে তল্লাশি শুরু হলো; আম পাওয়া গেলো এবং যথারীতি প্রত্যেককেই ১০০ ডলার করে ফাইন করা হলো। এবার আমি যতটুকু ইংলিশ জানি তার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করে অনুনয় বিনয় করলাম। কোরিয়ান মেয়ে দুজন—মানে একজন আমারই ল্যাবমেট জিয়ন, আরেকজন অন্য একটি ইউনিভারসিটির মেয়ে (নাম মনে পড়ছে না) সেও ভাঙ্গা ইংরেজি দিয়ে চেষ্টা চালালো। বোঝাতে চাইলাম, আমরা যে ছাত্র। শুধুমাত্র অজ্ঞতাবশেই কাজটা করেছি। একপর্যায়ে তারা তা বিশ্বাস করতে শুরু করল। সবশেষে আমাদের জরিমানা মওকুফ করা হলো। সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। যে আম নিয়ে এত কাহিনি, তার একটা ইতিহাস আছে। সালটা ২০০৮। আমরা কোরিয়া থেকে সিডনি যাচ্ছি সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে। উদ্দেশ্য সিডনিতে অনুষ্ঠিতব্য তাত্ত্বিক রসায়নবিদদের বিশ্ব সম্মেলনে (WATOC) যোগ দেওয়া। মাঝে ৬ ঘণ্টার ট্রানজিট। কী করা যায়? কোরিয়ানদের যে ভিসা লাগে না। কিন্তু আমি কী করব? বাংলাদেশকে সবাই তো একটু ভিন্ন চোখে দেখে! তবে মোক্ষম একটা অস্ত্র আছে, দেখা যাক কাজ করে কি-না। এবার ভালোই কাজ হলো, যেন আকাশ হাতে পেলাম। অফিসিয়াল পাসপোর্টধারীদের সিঙ্গাপুরে প্রবেশে ভিসা লাগে না। শুধুই কি প্রবেশ, সিঙ্গাপুর সরকারের পর্যটন মন্ত্রণালয় এই ট্রানজিটধারীদের বিনে পয়সায় গাড়ির ব্যবস্থা রেখেছেন সিঙ্গাপুর ঘুরে দেখার জন্য। ট্যুরিজমের কি সুন্দর ক্যাম্পেইন! আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো বুগিজ ভিলেজে। সেপ্টেম্বর মাস, কিন্তু বেশ গরম। পরে জেনেছি, সিঙ্গাপুরে একটাই ঋতু। সারাবছরই গরম। দেশটির কথা অনেক শুনেছি, অনেক প্রশংসা। সত্যি বলতে কি, কোরিয়ার উন্নতির কাছে সিঙ্গাপুর নেহাতই পিছিয়ে। যাহোক, প্রায় ৪ ঘণ্টা সময় আমরা বুগিজ ভিলেজে কাটালাম। টুকটাক কেনাকাটাও করলাম। তবে সবচেয়ে বেশি খুশি হই বড় বড় আম দেখে। সবাই আম কিনলাম। ইচ্ছেমতো খেলাম। আমগুলো খুবই মিষ্টি। থাইল্যান্ডের আম। গত ২ বছরে কোরিয়াতে কত ফল খেয়েছি, তবে আম পাইনি। মনের আনন্দে আম খাওয়ার পর দুটি আম আমার অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ফলিত রসায়নের বন্ধু রোমান ও রাসেলের জন্য নিয়ে যাওয়ার মনস্থির করলাম। আর তারপরই এতসব বিপত্তি।

 

লেখক : ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ

আঞ্চলিক পরিচালক (দায়িত্বপ্রাপ্ত), বাংলাদেশ বেতার, রংপুর।