দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ঢাকা ওআইসি ইয়ুথ ক্যাপিটাল-২০২০। মুসলিম বিশ্বের তরুণদের দৃঢ় ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করা ও তরুণদের নানামুখী কৃতিত্বে উত্সাহ প্রদানের লক্ষ্যে ইসলামিক কো-অপারেশন ইয়ুথ ফোরাম (আইসিওয়াইফ) ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশসমূহকে ‘ওআইসি ইয়ুথ ক্যাপিটাল’-এর স্বীকৃতি প্রদান করে আসছে। গত ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া তীব্র প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করে ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ গৌরবজনক এই স্বীকৃতি অর্জন করে। গত ২৭ জুলাই বিকাল ৪টায় ঢাকা ওআইসি ইয়ুথ ক্যাপিটাল-২০২০ এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বজুড়ে তরুণদের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য একটি যোগসূত্র তৈরির প্রচেষ্টায় ২৭ ও ২৮ জুলাই দুই দিনব্যাপী মোট তিন পর্বে ভার্চুয়ালি আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠানটি। বিশ্বের মোট ৭৫টি দেশের ২৫০ জন অংশগ্রহণকারীর উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অতিথিবৃন্দ অনলাইন প্লাটফর্মের মাধ্যমে তরুণদের উদ্দেশ্যে তাদের মূল্যবান বক্তৃতা, ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা ও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ নিয়েই আমাদের এবারের আয়োজন। গ্রন্থনা করেছেন জাহিদ হাসান দিপু ও আফরিদা ইফরাত
১ম পর্ব
কোভিড-১৯ সংকট :স্থিতিশীল ভবিষ্যত্ গঠনে তারুণ্য ও প্রযুক্তি
‘তরুণরাই উন্নত বাংলাদেশ গঠনে মূল চালিকাশক্তি হবে।’
মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, প্রতিমন্ত্রী, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়
করোনাকালে দেশের তরুণদের বেকারত্ব দূরীকরণ ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তাদেরকে বিভিন্ন কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। একইসঙ্গে যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে দক্ষ মানবশক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে যারা ২০৪১ সালের মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত উন্নত বাংলাদেশ গঠনে মূল চালিকাশক্তি হবে।
‘লক্ষ্য বৈশ্বিক উন্নয়নে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।’
তাহা আয়হান, সভাপতি, ইসলামিক কো-অপারেশন ইয়ুথ ফোরাম
তরুণ সমাজ আমাদের সমপ্রদায়, সমাজ এবং জাতির মূল কেন্দ্রবিন্দু। দেশের ও বৈশ্বিক উন্নয়নে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণই কার্যকর সমাধান নিরুপণ ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজতে সহায়তা করতে পারে। তাই আমাদের লক্ষ্য তাদের ভবিষ্যতের পথ প্রদর্শক করে গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক উন্নয়নে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
‘প্রযুক্তি তরুণ সমাজকে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলছে।’
সুদীপ্ত মুখার্জী, আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ইউএনডিপি বাংলাদেশ
প্রযুক্তির কল্যাণে আজ মানুষের জীবন অনেকটা সহজ হয়ে গিয়েছে। অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের। একইসঙ্গে এই প্রযুক্তি তরুণ সমাজকে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলছে। এর কল্যাণেই ধীরে ধীরে বিশ্বের তরুণদের মধ্যে কমে আসছে দূরত্ব।
‘তরুণরাই আগামী দিনে বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
মাসুদ বিন মোমেন, সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন উন্নয়নের পথে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। তাই আমাদের উচিত দেশের তরুণদের আরও দক্ষ ও প্রাণবন্ত করে গড়ে তোলা। কেননা তারাই আগামী দিনে বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
‘সংকটকালে বেকারত্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করব।’
শেখ ফজলে ফাহিম, সভাপতি, এফবিসিসিআই
করোনাকালীন সংকটে বেকারত্বই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাই ওআইসি ইয়ুথ ফোরামের সঙ্গে একযোগে কাজ চালিয়ে যাবে এফবিসিসিআই।
পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন এটুআই’র পলিসি অ্যাডভাইজার আনির চৌধুরী, রাষ্ট্রপতির বিশেষ দূত আবুল কালাম আজাদ, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের প্রধান বৈশ্বিক অর্থনীতি পর্যবেক্ষক ড. হামিদ রশিদ এবং সোলশেয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. সিবাস্টিন গ্রো।
২য় পর্ব
ভার্চুয়ালি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভ্রমণ
‘আমাদের এই একত্র হওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হলো তরুণদের উন্নয়ন’
নাহিম রাজ্জাক এমপি
সদস্য, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
আমাদের আজ এখানে একত্র হওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হলো তরুণ সমাজের উন্নয়ন। আজকের এই প্লাটফর্ম থেকে আমরা দেশের তথা বিশ্বের তরুণ সমাজকে জানাতে চাই—দেশের তথা বিশ্বের তরুণদের জন্য আমরা কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছি এবং কিভাবে সবাই একত্র হয়ে আমরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারি।
‘রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান বের করতে হবে।’
মো. দেলোয়ার হোসেন, মহাপরিচালক, মিয়ানমার উইং, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
জীবনের তাগিদেই এক সময় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসে। তাদের ফিরিয়ে দেয়নি বাংলাদেশ। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ক্যাম্পে থাকা এই রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। আমাদের মিত্রদের মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান বের করার আহ্বান জানাচ্ছি।
‘রোহিঙ্গাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে জাতিসংঘ।’
মিয়া সেপ্পো, আঞ্চলিক সমন্বয়ক, জাতিসংঘ
আমি প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণকে এই বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গা অভিবাসীদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি সুরক্ষিত রাখার জন্য। বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি জাতিসংঘের আরও ৯টি সংস্থা তাদের জন্য ক্যাম্পগুলোতে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও রোহিঙ্গাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে জাতিসংঘ।
‘রোহিঙ্গা তরুণদের ভবিষ্যত্ ও কর্মসংস্থানে সাহায্য করবে ইইউ।’
রেন্সজে তেরিংক, বাংলাদেশস্থ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত
রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ে এবং তাদের সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে কাজ করছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, এনজিও এবং অসংখ্য সংগঠন। সেখানকার তরুণ সমাজের ভবিষ্যত্ গঠন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে তাই বাংলাদেশ সরকারকে সব ধরনের সাহায্য করে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নাহিম রাজ্জাক এমপির সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মাহবুব আলম তালুকদার, আইওএম বাংলাদেশের মিশন প্রধান জর্জি গিগৌরি, স্বাধীনতা জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হেড অব অফিস কাই ভন হার্বো।
৩য় পর্ব
গণহত্যা ও তরুণদের ভবিষ্যত্ কর্তব্য
‘আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবতার এক নতুন মাইলফলক।’
কাজী নাবিল আহমেদ এমপি, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য
আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার রোহিঙ্গা নির্যাতন ও গণহত্যার বিচার দাবি এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। কানাডা ও নেদারল্যান্ডের সমর্থন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবতার এক নতুন মাইলফলক উন্মোচন করেছে। একইসঙ্গে এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা মিয়ানমারে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্বের এক শক্ত অবস্থান নির্দেশ করে।
‘প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ করে তুলতে পারে।’
মো. আখতার হোসেন, সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়
কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে একটি স্থিতিশীল বিশ্ব গঠনের লক্ষ্যে তরুণ যুবসমাজ বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ ও গৃহীত বিশেষ প্রকল্প ইত্যাদিতে নিজেদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তারা আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
‘তরুণদের সমস্যা সমাধানে এক হয়ে কাজ করতে হবে।’
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাবি
গণহত্যা একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। গণহত্যা কোনো অঞ্চলভিত্তিক সমস্যা নয়, স্বভাবগত কারণেই এটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। তাই এই প্রজন্মের তরুণদের গণহত্যা কী— সেটা জানতে হবে। তাদের এই সমস্যা সমাধানে এক হয়ে কাজ করতে হবে।
‘শান্তি একমাত্র তরুণ সমাজের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে।’
আবদুল হামিত গুল, আইনমন্ত্রী, তুরস্ক
তরুণদের জন্যে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের গুরুত্ব অপরিসীম। সমগ্র মানবজাতিতে ন্যায় ও নীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংগঠন সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। শান্তি আমাদের জীবনে প্রধান কাম্য। আর এই শান্তি একমাত্র তরুণ সমাজের পরিশ্রম, চিন্তা-ভাবনা ও সংগ্রামের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে। এতে করে সমাজের প্রত্যেকেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ এমপির সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. পায়ম আখওয়ান এবং লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যান্টোনিয়া মুলভে।
