অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের খননযন্ত্রে দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি মি উই ৫ (SEA-ME-WE 5) কাটা পড়িয়াছিল। প্রায় ১৩ ঘণ্টা সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দেশের ইন্টারনেটসেবাই শুধু মন্থর হয় নাই, দেশের ক্ষতি হইয়াছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। সি মি উই ৫ হইল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম ইউরোপের একটি অপটিক্যাল ফাইবার সাবমেরিন ক্যাবল, যাহা সিঙ্গাপুর হইতে ফ্রান্স পর্যন্ত টেলি যোগাযোগ প্রবাহিত করে। এই ক্যাবল ১৯টি ল্যান্ডিং পয়েন্টের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, জিবুতি, ইয়েমেন, সৌদি আরব, মিশর, ইতালি, তুরস্ক ও ফ্রান্সকে সংযুক্ত করিয়াছে। ২০১৭ সালের শুরুতেই পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় সংযোগের মাধ্যমে এই বিশাল আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ। বুঝিতে অসুবিধা হয় না ইহার গুরুত্ব কতখানি।
যাহারা এই ক্যাবলের ক্ষতি সাধন করিয়াছে, তাহাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড মামলা করিয়াছে। পুলিশ যথারীতি তাহাদের গ্রেফতার করিয়াছে আইনানুগ ব্যবস্থা হিসাবে। এই ক্যাবল লাইন যথেষ্ট পুরু এবং তাহা কয়েক স্তরে আচ্ছাদন রহিয়াছে। প্রশ্ন হইল, এই রকম একটি স্পর্শকাতর এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন করে কী করিয়া। তাহাও আবার স্ক্যালেটন বা খননযন্ত্র ব্যবহার করিয়া। শুধু তাহাই নহে, সাবমেরিন ক্যাবলটি উপকূল হইতে মাত্র সাড়ে ছয় কিলোমিটার ভিতরে স্থলভাগে ল্যান্ডিং স্টেশন পর্যন্ত। যেইখানে লাইন কাটা পড়িয়াছে, সেই স্থল হইতে মাত্র দেড় মাইল দূরে অবস্থিত ল্যান্ডিং স্টেশন। এমন একটি বিশাল কর্মকাণ্ডের দেখভাল করিবার জন্য রহিয়াছেন প্রকৌশলীসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ। তাহারা কি এই যন্ত্র দিয়া বালু উত্তোলন কাজ দেখিতে পান নাই? নাকি প্রভাবশালীদের কাজ বলিয়া মুখ ঘুরাইয়া রাখিয়াছেন? শুধু ক্যাবলের ক্ষেত্রে নহে, আমরা সমগ্র দেশেই এই ধরনের ক্ষমতাশালীদের অপকর্ম এবং প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্লিপ্ততা লক্ষ করিতেছি।
আরো হতাশার বিষয় হইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হইবার পর এবং ল্যান্ডিং স্টেশন হইতে বিদ্যুত্ চলিয়া যাইবার পরও তাহারা বুঝিতে পারেন নাই যে কী ঘটিয়াছে। ঐ অফিস হইতে ঢাকায় যোগাযোগ করা হইলে তাহারা পরামর্শ দেন লাইন পরীক্ষা করিতে। এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দায় লইবে কে? মামলা করিয়া গাফিলতির দায় এড়ানো যাইবে কি? আমরা মনে করি, যাহারা বালু উত্তোলন করিতে গিয়া ক্যাবল কাটিয়াছে তাহাদের চাইতে দায়িত্ব অবহেলাকারীরা কম দায়ী নহে। মাঝে মাঝে আমাদের মনে হয়, এই প্রকারের দায়িত্বজ্ঞানহীনদের হয়তো সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত করিতে পারিলেই অন্যদের সচেতনতা আসিবে। তাহা না হইলে বুঝি এইভাবেই চলিতে থাকিবে। কিন্তু উহা তো আর বলিতে পারি না। আইনের মধ্যে থাকিয়াই আমাদের কথা বলিতে হয়। কেবল আইনের মধ্যে থাকে না এই সকল অপরাধী এবং তাহাদের অপকর্ম মানিয়া লওয়া সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরা।
