আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের নিকট ইলিশ অত্যন্ত প্রিয়। এই উপাদেয় মাছটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নহে। ইলিশের জীবনে নানা রহস্য রহিয়াছে, কিন্তু আমরা কেবল ইলিশের আচরণগত বৈশিষ্ট্য জানি। সমুদ্র হইতে ইলিশ কেন নদীতে আসে, আবার নদী হইতে সমুদ্রে কেন ফিরিয়া যায়? কেন ইলিশের এই আসা-যাওয়া? প্রকৃতি, না কি জিন নিয়ন্ত্রণ করে ইলিশের এই আচরণ? এইসকল প্রশ্নের উত্তর জানি না আমরা।
কিন্তু ইলিশের জিন আবিষ্কার এইসব রহস্য উন্মোচনের দ্বার খুলিয়া দিয়াছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা উদ্ঘাটন করিয়াছেন ইলিশের জিনোম বিন্যাস। ইহার ফলে ইলিশের জীবনের সকল রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হইবে। গত বত্সরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশি গবেষক দল উদ্ভাবিত পদ্মার ইলিশের জিন বিন্যাস বা জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্বখ্যাত লন্ডনভিত্তিক জার্নাল বায়োমেড সেন্ট্রাল (বিএমসি) প্রকাশ করিয়াছে। ইতিপূর্বে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসাবে স্বীকৃতির পর এইবার ইলিশের জীবনরহস্য উদ্ঘাটনেরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করিল বাংলাদেশ। অনেক আবিষ্কারের নেপথ্যেই বেশ মজার ঘটনা থাকে—ইলিশের এই জিন আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও তাহা রহিয়াছে। জানা যায়, ইলিশের জিন আবিষ্কারের প্রথম উদ্যোক্তা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মং সানু প্রায় পৌনে তিন বত্সর পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের একটি দোকানে ইলিশ দেখিয়া ক্রয় করিতে চাহেন। কিন্তু ইলিশের দামটি তাহার নিকট অনেক বেশি বলিয়া মনে হয়, কেজিতে প্রায় ৩০ ডলার। পাশাপাশি, স্যামন মাছের দাম কেজিপ্রতি মাত্র ১০ ডলার! স্বাদে পার্থক্য থাকিলেও ইলিশের সঙ্গে স্যামন মাছের মিল হইতেছে দুইটি মাছই স্বাদু ও লোনা পানিতে টিকিয়া থাকে। বিজ্ঞানী মং সানু জানেন, স্যামনের জিনোম বিন্যাস আবিষ্কার করিয়াছেন বিজ্ঞানীরা। ফলে স্যামনের জীবনরহস্য এখন বিজ্ঞানীদের হাতের মুঠোয়। তিনিও এই কাজেরই গবেষক। তাহার আবিষ্কৃত প্রযুক্তি ডিএনএ বিন্যাস কাজে ব্যবহূত হয়। অতঃপর ইলিশের জীবনরহস্য উদ্ঘাটনের অভিপ্রায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খানের নেতৃত্বে গবেষণাকর্মে যুক্ত হন তিনি। যুক্ত হন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ইলিশ গবেষক এম নিয়ামুল নাসেরসহ আরও অনেকে।
গবেষণায় ইলিশের বংশানুগতি সম্পর্কিত যেই তথ্য পাওয়া গিয়াছে তাহাতে দেখা গিয়াছে, ইলিশের পুরা ডিএনএ (জিনোম)-এর ক্ষেত্রে প্রায় ১০০ কোটি বেসপেয়ার তথা কেমিকেল ইউনিট রহিয়াছে এবং জিন রয়েছে ৩১ হাজার ২৯৫টি। উল্লেখ্য যে, মানুষের ডিএনএ-তে রহিয়াছে ৩২০ কোটি বেসপেয়ার। সুতরাং এইবার জানা যাইবে ইলিশের জেন্ডার সম্পর্কে। বড় ইলিশগুলিকে মেয়ে ইলিশ ও ছোট ইলিশগুলিকে পুরুষ ইলিশ হিসাবে পাওয়া যায়—জানা যাইবে তাহার রহস্য। সমুদ্রের কিছু মাছের মতো ইলিশেরও জেন্ডার পরিবর্তনের রহস্য রহিয়াছে কি না—তাহাও জানা যাইবে। অন্যসকল মাছের মতো ইলিশেরও রোগবালাই আছে—জানা যাইবে সেইসকল রোগবালাইয়েরও রহস্য। কেন ইলিশ এত সুস্বাদু হয়? কেন একেক এলাকায় ইলিশের স্বাদ পাল্টায়, পদ্মার ইলিশই-বা কেন বেশি সুস্বাদু? স্বাদ অটুট রাখিয়া ইলিশ কি চাষ করা সম্ভব? এমন সব প্রশ্নের জবাব পাইবার দরজাটি খুলিয়া দিলেন এই সকল বিজ্ঞানী। ইহার জন্য অভিনন্দন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের।
