ধর্ষকরা কি মানুষ?

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৪২

আলমগীর হাসান আবির

স্বামী-সন্তানকে বেঁধে গৃহবধূকে গণধর্ষণ! শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকে সংবাদটি পড়ে যেকোনো সুস্থ মনের মানুষের কষ্ট পাওয়ার কথা এবং আমারও সেটাই হলো। প্রথমেই মনে পড়লো ২০০১ সালে নির্বাচনের পর ঘটে যাওয়া অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী পূর্ণিমা রানির মায়ের শতাব্দীর সবচাইতে করুণ আকুতি ‘বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট। তোমরা একজন একজন করে এসো, ও মরে যাবে’। দেড়যুগ পর আবারও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। যেখানে একজন মা তার স্বামী-সন্তানের সামনে সম্ভ্রম বাঁচাতে আকুতি করে। আমি ভাবি ওরা মানুষ নাকি মানুষরূপী জানোয়ার? যদি মানুষরূপী জানোয়ার হয় তাহলে সমাজ কেন তাদেরকে মৌলিক অধিকার দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে? চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণ, প্রেমে অসম্মতি জানালে ধর্ষণ, কাজের মেয়েকে ধর্ষণ, নিজের মেয়েকে ধর্ষণ, সহকর্মীকে ধর্ষণ, সহপাঠীকে ধর্ষণ, ভোট না দেয়ায় ধর্ষণ এরকম আর কত ধর্ষণের রূপ আমাদের দেখতে হবে! যে নারীতে সৃষ্টি শুরু হয়, যে নারীর গর্ভে পুরুষের সৃষ্টি, যে নারীর অনন্ত রূপ মা, সেই নারীদের দেখলেই ‘আট থেকে আশি’ যেকোনো বয়সের হোক না কেন তাদের সঙ্গে অবলীলায় ধর্ষণের মত নোংরামি করে চলেছি। আমি বলি কি- হাত, কান, চোখ, নাক থাকলেই মানুষ হওয়া যায় না। মানুষ হতে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের প্রয়োজন আর তা হলো মানবিকতা। একজন ধর্ষকের ভিতর মানবিকতা অনুপস্থিত। অতএব, তাকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দেয়াই শ্রেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হলো ধর্ষিতা মায়ের জন্য বিচার চাওয়ার পরিবর্তে ধর্ষকরা কোন্ দলের সেটা তাদের কাছে মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা কোন্ দলের অনুসারী সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো তারা ধর্ষক, একজন মা ধর্ষিত হয়েছেন। অতএব, এই দায় আমাদের কারোর অস্বীকার করার সুযোগ নাই। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ও ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটি সূত্র অনুসারে, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা এবং সাড়ে ৪ লাখেরও বেশি নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিলো। যার ফলে প্রায় ২৫ হাজার নারী গর্ভধারণ করেছিলেন। তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন: ‘ধর্ষিতা মেয়ের বাবার নামের জায়গায় আমার নাম লিখে দাও- শেখ মুজিবুর রহমান। আর ঠিকানা লেখো ধানমণ্ডি বত্রিশ। মুক্তিযুদ্ধে আমার মেয়েরা যা দিয়েছে সেই ঋণ আমি কিভাবে শোধ করব?’ আজ বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাবার আদর্শে সোনার বাংলা গড়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে তা ছিলো প্রশংসার দাবিদার। ইতোমধ্যে চতুর্থবারের মত শপথ নিয়েছেন এবং আশাকরি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এসব নরপশুদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিবেন। যাতে ভবিষ্যতে এসব নরপিশাচরা কোনো নারীর দিকে বিকৃত দৃষ্টিতে তাকানোর সাহস না পায়। কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো নতুন কোনো ইস্যুতে সোহাগী জাহান তনু ধর্ষণ, টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে রুপাকে ধর্ষণ, বনানীতে জন্মদিনের পার্টিতে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণ ঘটনাগুলোর মত এটাও যেনো হারিয়ে না যায়। আমার মতে, ধর্ষণ পুরোটাই ধর্ষকের মানসিক বিকৃতি এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা চর্চার প্রভাব। তাই শুধু আইন বা বিচার দিয়ে একে ঠেকানো যাবে না। যদিও কোনো অপরাধ কখনোই নিঃশেষ করা যায় না কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাই ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণে সামাজিক সচেতনতার বলয় তৈরি করতে হবে, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা চর্চার মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, নারীরা শুধু ভোগ্যপণ্য বা সেবাদাতা নয় তারাও মানুষ এই মনোভাব তৈরি করতে হবে, ধর্মীয় অনুশাসন মানতে হবে। সবশেষে একটাই চাওয়া— এই সমাজে ভালো থাকুক সব মায়েরা। নিরাপদে থাকুক সেই নারীসত্তা, যে নারীসত্তার হাত ধরে মা নামক স্বর্গীয় শব্দটির পৃথিবীতে আবির্ভাব হয়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়