দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৪৩

জুবায়ের আহমেদ

সমুদ্র রাজনীতিতে একটি প্রণিধানযোগ্য ও প্রসিদ্ধ নীতি প্রচলিত আছে, যেই নীতির আদলে আজকে বিশ্ব রাজনীতির গতিবিধি, উত্থান-পতন ও নিয়ন্ত্রণ পরিচালিত হচ্ছে। ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে থেকেই সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো আবিষ্কার করতে লাগলো যে তাদের এই বাণিজ্যিক আধিপত্য বজায় রাখতে, স্বভূমি বহিঃআক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখতে এবং উঠন্ত শিল্পভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা বিনির্মাণে সমুদ্রের গুরুত্ব অপরিসীম। আমেরিকার সমুদ্রবিষয়ক কুশলী আলফ্রেড থায়েরমেইহেনের ‘দি ইনফ্লুয়েন্স অব সি পাওয়ার আপোনহিস্ট্রি’ বইয়ে যথার্থই তার উক্ত নীতি বিশ্লেষণ করে গেছেন যে, উদ্ধৃতি ‘Whoever controls the waves controls the world’ অর্থাত্ সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ হাতে যার, বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ হাতে তার।

এই সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিযোগিতার এক বড় ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ চীন সাগর। এটার ভৌগোলিক অবস্থান তথা ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় চীন, আমেরিকা ও এই সাগরের অন্যান্য পাড় সংলগ্ন দেশগুলো এক তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিবহন সংঘটিত হয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই অঞ্চল দিয়ে। পৃথিবীর দশ শতাংশ সামুদ্রিক মত্স্য, এগারো বিলিয়ন ব্যারেল পরিমাণ তেল ও একশ’ বিরানব্বই ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাসের এক বিশাল ভাণ্ডার নিয়ে এশিয়ার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এই দক্ষিণ চীন সাগর।

আমেরিকাও আন্তর্জাতিক পানিতে অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার তাগিদে তাদের যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী নৌবহরের সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে দক্ষিণ চীন সাগরে।  পূর্বাঞ্চলীয় প্রশান্ত মহাসাগরে আমেরিকা তার উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে চীনের এই মহাগুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বাণিজ্য পরিবহন রুটে একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত করা থেকে বিরত রাখতে বদ্ধপরিকর। এই দ্বিমুখী নীতি দুই পরাশক্তিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরে। সব থেকে বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে এশিয়ায় আমেরিকার সব থেকে বড় দুই বন্ধুরাষ্ট্র জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য। দক্ষিণ চীন সাগরের উপর অতিমাত্রিক বাণিজ্যিক নির্ভরশীলতাই তাদের অস্বস্তির পুরোটা জুড়ে বিরাজমান। দক্ষিণ কোরিয়ার দুই-তৃতীয়াংশ ও জাপানের ষাট শতাংশ জ্বালানি শক্তির পরিবহন হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ  দক্ষিণ চীন সাগরের পেট চিরে। সুতরাং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একচ্ছত্র অধিপতি বনে যাওয়ার ব্যাপারটা মোটেও তাদের জন্য সুখকর নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমেরিকার জাতীয় কৌশলের একটি প্রধানতম অঘোষিত উপাদান হলো সামুদ্রিক প্রাধান্য বজায় রাখা।

সমুদ্র নিয়ন্ত্রণের মধ্যদিয়ে বিশ্বের সব থেকে বড় অর্থনীতির দেশ আমেরিকা বিশ্বব্যাপী তাদের পণ্যের অবাধ যাতায়াত ও বিশ্বের চতুর্দিকে তার সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করে ও সর্বোপরি বিশ্বে কোথাও আমেরিকার জন্য হুমকি বা বিপদ হতে পারে এমন কিছু মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আগেই তা যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা যায় যা এই কৌশলের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। লক্ষণীয় যে, উত্তরের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উক্ত লক্ষ্য অর্জনে আমেরিকার পথকে মসৃণ করে দিতো জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।

সবদিক বিবেচনায় এশিয়ায় আমেরিকার নেতৃত্বকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দক্ষিণ চীন সাগরের গুরুত্ব অপরিসীম। এশিয়ায় চীনের আধিপত্য দিনকে দিন বাড়ছে। আর দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য নিঃসন্দেহে আমেরিকার বহুদিনের বৈশ্বিক নেতৃত্ব অন্তত এশিয়ায় হুমকির মুখে ফেলে দেবে। আমেরিকারও তার বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে দক্ষিণ চীন সাগরে চীন বিরোধী  অবস্থান ও সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

চীনের জন্য সব থেকে ইতিবাচক দিক হলো চীন পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। দুই দেশই পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন হওয়ায় বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আইল ঠেলাঠেলি সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র যুদ্ধের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। দু’দেশেরই পিছু না হটার মানসিকতা যে জটিল সমীকরণ দাঁড় করিয়েছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ চীন সাগরে এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রাজনৈতিক অঙ্গনকে অনেক অস্থিতিশীল ও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়