সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে এগারসিন্দুর

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৪৭

পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার এগারসিন্দুরের রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য। রাজধানী ঢাকার সাথে সহজ ও সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা, এখানকার আবহাওয়া, পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে এগারসিন্দুর একটি সম্ভাবনাময় পিকনিক স্পট। এখানে রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্য শৈলীর অনন্য নিদর্শন। বার ভূঁইয়ার প্রধান বীর ঈশাখাঁর দুর্গ ছিল এখানে। ঈশাখাঁ ও মোগল সেনাপতি মানসিংহের মধ্যে ইতিহাসখ্যাত যুদ্ধও হয়েছিল এখানে।

বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় লাল মাটির এ অঞ্চলটি সবচেয়ে প্রাচীনতম। এর নিদর্শন এ স্থানের একাধিক প্রাচীন সমাধি। তেমনই দুটি প্রাচীন সমাধির অনন্য নিদর্শন হয়ে রয়েছে শাহ্ মাহমুদ মসজিদ ও সাদী মসজিদ। এছাড়াও রয়েছে কিংবদন্তির বেবুদ রাজার দিঘি।

এগারসিন্দুরের ঐতিহ্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এগারসিন্দুর দুর্গ। এগারসিন্দুর দুর্গ নির্মাতা নিয়ে রয়েছে মতভেদ। কেউ বলেন, রাজা আজাহাবা আবার কারো মতে বেবুদ রাজা এবং কারো মতে রাজা গৌর গৌবিন্দ। সুলতানী আমলের পরই এগারসিন্দুর এলাকাটি কোচ হাজংদের অধীনে চলে যায়। বাংলার বার ভূঁইয়ার প্রধান ঈশাখাঁ কোচ হাজং রাজাদের পরাজিত করে এগারসিন্দুর দুর্গটি দখল করেন। এ দুর্গ থেকেই পরবর্তীতে মোঘল সেনাপতি রাজা দুর্জন সিংহ ও পরে রাজা মানসিংহকে পরাজিত করতে সমর্থ হন। তখন থেকেই এগারসিন্দুর দুর্গটি ঈশাখাঁর দুর্গ নামে খ্যাত। উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে মঠখোলা-মির্জাপুর-পাকুন্দিয়া সড়কের পাশে এটি অবস্থিত।

এগারসিন্দুরের একটি প্রাচীন স্থাপত্য হচ্ছে শাহ্ মাহমুদ মসজিদ ও বালাখানা। গবেষকদের মতে, এটি ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে নির্মিত হয়। বর্গাকৃতির এ মসজিদটির প্রত্যেক বাহু ৩২ ফুট। চার কোণায় ৪টি বুরুজ রয়েছে। রয়েছে একটি বিশাল গম্বুজ। দু’পাশে দুটি সরু মিনার রয়েছে। শাহ্ মাহমুদ এ মসজিদ ও বালাখানা নির্মাণ করেছিলেন বলে এর নামকরণ হয় শাহ্ মাহমুদ মসজিদ।

এছাড়াও এখানে সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয় সাদী মসজিদ। পোড়ামাটির অলংকরণে সমৃদ্ধ এ মসজিদটি সম্পূর্ণ ইটের তৈরি। এটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট বর্গাকৃতি মসজিদ। প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য ২৭ ফুট। চারপাশে চারটি বুরুজ। পূর্ব দেয়ালে ৩টি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ১টি করে প্রবেশ দ্বার রয়েছে। ১০৬২ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে শাহজাহান বাদশা গাজীর রাজত্বকালে শেখ নিরুর পুত্র সাদীর উদ্যোগে এ মসজিদটি নির্মিত হয় বলে এর নামকরণ হয় সাদী মসজিদ।

এগারসিন্দুরের প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে বেবুদ রাজার দিঘি অন্যতম। বেবুদ নামে হাজং রাজা বাস করতেন এখানে। একবার প্রচণ্ড খরা দেখা দেওয়ায় রাজা প্রজাদের কল্যাণে পঞ্চাশ একর জমি বিস্তৃত একটি দীঘি কাটলেন। কিন্তু পানির নাম-গন্ধ নেই। এরই মধ্যে রাজা স্বপ্নে দেখেন তার রাণী যদি দীঘিতে নামে তবে পানি উঠবে। স্বপ্নের কথা রাজা রাণীকে জানালে প্রজাদের মুখের পানে চেয়ে রাণী দীঘিতে নামতে রাজি হলেন তাতে রাজাও খুশি হলেন এবং পরদিন রাণী এক বাটি কাঁচা দুধ, পান সুপারি ও সিঁদুর নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দীঘিতে নামলেন। সাথে সাথেই দীঘির চারপাশ থেকে স্বচ্ছ জল এসে দীঘি ভরে গেল কিন্তু রাণী আর দীঘি থেকে উঠতে পারলেন না। চোখের পলকে রাণীর কেশগুচ্ছ বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে নিমজ্জিত হয়ে গেল। রাজা রাণীর জন্য পাগল প্রায় হয়ে গেলেন। বেবুদ রাজা দীঘিটি খনন করেন বিধায় তার নামানুসারে দীঘিটি বেবুদ রাজার দীঘি নামে পরিচিত। এ দীঘির পানিতে গাছের পাতা কিংবা অন্য কোনো কিছু পড়ে থাকলে তা পরদিন সকালে পাড়ে এসে জমা হয়।

সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় অযত্নে-অবহেলায় পড়ে রয়েছে প্রাচীন এ ঐতিহ্যগুলো। সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে এখানে একটি পিকনিক স্পট গড়ে তুললে ইতিহাসখ্যাত এ অঞ্চলের পরিচিতি একদিকে যেমন তুলে ধরা যাবে অপরদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও এখানে পিকনিক স্পট গড়ে তোলা হলে অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। এতে এ অঞ্চলের বেকারত্বের সংখ্যা কমে আসবে।