‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।’ তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণের এই একটি বাক্যই বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের তাত্পর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
ইতিহাস সাক্ষী যে, একজন বঙ্গবন্ধুর তর্জনীই একটা নিদ্রিত জাতির বুকে সাহস সঞ্চার করে, একই সঙ্গে যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়েই সংগ্রাম করতে শিখিয়েছিল। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে বৃহত্ পরাশক্তিকেও যে কাবু করে দেওয়া যায়, বাঙালিদের সেই কৌশলই শিক্ষা দিয়েছিলেন গোপালগঞ্জের ছোট্ট সেই খোকা।
এই মহান মানুষটি গণমানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের স্বার্থে সারাটি জীবন সংগ্রাম করতে গিয়ে অন্যায়ের সঙ্গে আপোসহীনতার কারণে বিভিন্ন সময়ে মোট ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে ৭ দিন ব্রিটিশ আমলে আর বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিনই ছিল পাকিস্তান আমলে।
জীবনের শেষ কারাবাস শেষে, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তন করে বঙ্গবন্ধু এদেশকে এক বিরাট ধ্বংসস্তূপ হিসেবে দেখতে পান। পরে তাঁর নেতৃত্বেই শুরু হয় নবরাষ্ট্রের পুনর্গঠন কার্যক্রম। নতুন করে গঠিত হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
যখন শহরগুলোকে দেখা গিয়েছিল ভুতুড়ে নগরী হিসেবে, যখন ৬০ লাখ ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, ২৪ লাখ কৃষক-পরিবারে যখন কোনো কৃষি উপকরণ ছিল না, যখন রাস্তা-ঘাট, পুল-কালবার্ট একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল এবং সব ধরনের যোগাযোগেই বিঘ্ন ঘটেছিল, অর্থনীতির ভিত একেবারে ধ্বংস হয়ে যখন অভাবের তাড়নায় চারদিক থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল প্রতিনিয়ত, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে, এরকম করুণ অবস্থায়ই বঙ্গবন্ধু এদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে নতুন করে সাজানোর স্বপ্ন এঁকেছিলেন। এসময় তিনি দুর্ভিক্ষরোধে, শরণার্থীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাসহ কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রের স্বীকৃতির জন্য ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে দেশে দেশে ছুটে বেড়িয়েছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বেই জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এই চারটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে সুন্দর একটি সংবিধান রচিত হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তাঁর দল ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্য, পানি ও বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হয়। এভাবে নবগঠিত বাংলাদেশে বিভিন্ন সমস্যা, অভাব, বিভিন্ন সেক্টরে অদক্ষতা, মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি ও দেশব্যাপী নানাবিধ অস্থিরতার মধ্যেও তিনি দৃঢ়তা, অবিচলতা, সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে আমৃত্যু এদেশ পরিচালনা করে গেছেন।
জীবনের পুরোটা সময় এদেশের মাটি ও মানুষের জন্য ব্যয় করা এই মানুষটির বাংলাদেশকে নিয়ে ছিল দুঃসাহসিক স্বপ্ন। সর্বদা তাঁকে নির্যাতিত, দরিদ্র ও পরিশ্রমী মানুষদেরকে নিয়ে ভাবতে দেখা গেছে। মানুষের মৌলিক অধিকার যেমন—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সা ইত্যাদি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে মানুষের অভাব-অনটন, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ এবং উন্নত জীবনের লক্ষ্যে তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর ও অগ্রগামী ব্যক্তিত্ব।
কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাদ্যঘাটতি দূরীকরণে সৃজনশীল বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছিল তাঁর সরকার। এজন্যই ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও আবাদি জমি নষ্ট হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কৃষিকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এভাবে তিনি একটি ধ্বংসস্তূপকে প্রত্যেকটি সেক্টরের উন্নয়ন সাধন করার মাধ্যমে একটি ফুলবাগানে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস—১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী কিছু সেনাসদস্যের বর্বরোচিত হামলায় প্রাণ হারাতে হলো, স্বপ্নগুলোকে তাঁর নিজ হাতে বাস্তবায়ন করার সুযোগ তিনি পাননি।
কিন্তু আজকের বাংলাদেশ থেমে নেই। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, প্রতিনিয়ত তাঁর দেখানো পথকে ব্যবহার করে, তাঁরই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়ে এদেশের গণমানুষের মুখে হাসি ফোটানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টার সংগ্রাম পরিলক্ষিত হচ্ছে।
৫০ বছর পূর্বেও যে বাংলাদেশের অস্তিত্বই ছিল না সেই বাংলাদেশ এখন একটি স্যাটেলাইটের মালিক। এছাড়া আরো কয়েকটি স্যাটেলাইট উেক্ষপণসহ মঙ্গল অভিযানের স্বপ্নও দেখে এদেশ।
ছোট্ট ও জনবহুল একটি দেশ হয়েও প্রাকৃতিক দুর্যোগের দক্ষ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহারের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ, বৃক্ষরোপন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে ইতিবাচক সফলতায় এক দৃষ্টান্তের নাম বাংলাদেশ।
শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্য খাত, নারী ও শিশু উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটালাইজেশন, কৃষি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, প্রবাসী শ্রমিক উন্নয়ন, বিদ্যুত্, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি, দক্ষ ভূমি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ একটি উদাহরণ।
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে এত উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু জাতীয় অসামঞ্জস্যতারও ব্যাপক বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। তন্মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি, ধর্ষণ ও খুন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। পত্র-পত্রিকা খুললেই প্রতিনিয়ত এসব খবর আমরা দেখতে পাই। যেটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক এবং যা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় মোটেও মেনে নেওয়ার মতো ব্যাপার নয়।
এই গর্হিত কর্মকাণ্ডগুলো বর্জন করে, বঙ্গবন্ধুর আত্মা প্রশান্তি পাবে—এমন কাজ করে দল-মত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের সকলের এ দেশকে আরো এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে, সবসময় এটাই কামনা।
শিক্ষার্থী, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
