সঞ্চয় বিমুখতা অর্থনীতিতে সংকট সৃষ্টি করতে পারে

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২০, ২০:১৮

করোনার প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উত্পাদন, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হ্রাস পেয়েছে। এর প্রভাবে ব্যবসা, বাণিজ্য, পর্যটন, বিনোদন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যাংক ও বিমা খাত সংকুচিত হয়ে এবং কলকারখানার উত্পাদন আগের চেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। যার প্রতিঘাত হিসেবে অগণিত মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে। করোনার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এর মধ্যেই। বহু শ্রমিক বেকার হয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। অনেকের চাকরি নেই, হাতের জমানো টাকাও শেষ। সরকারের করোনাকালীন বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির তালিকায় দরিদ্র মানুষ নাম উঠাতে পারলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত কারো কাছে হাত পাততে পারছেন না। করোনা এসব নগরবাসীকে এখনো বাধ্য করছে স্থায়ীভাবে গ্রামে ফিরে যেতে। পিকআপ, ভ্যানগাড়ি বা ট্রাকে মালামাল নিয়ে পরিবারসহ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাওয়ার চিত্র এখন পুরো শহরজুড়ে। কেউবা আর্থিক সঙ্গতি কমে যাওয়ায় বড় ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে ছোট ফ্ল্যাট বা সাবলেটে ভাড়া থাকার চেষ্টা করছেন। যারা এখনো যাননি তারাও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়ার। জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ও আউটসোর্সিং ভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মচারীদের অনেকে গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। কাউকে বাধ্যতামূলক ছুটি দেওয়া হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইও করা হয়েছে। এছাড়া বাসাবাড়িতে ও মেসে গৃহকর্মীদের কাজে না রাখার কারণে তারা কর্মহীন, বেকার হয়ে খালি হাতে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও হকারদের পণ্য বিক্রির সুযোগ কমে যাওয়ায় তারাও বিপাকে পড়েছেন। মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষই ব্যাংকে ডিপিএসসহ বিভিন্ন সঞ্চয়ী স্কিমে এবং সঞ্চয়পত্র কেনার মাধ্যমে তাদের সঞ্চিত অর্থ ভবিষ্যতের জন্য জমা রাখে। কিন্তু গত পাঁচ মাসের করোনাকালীন সংকট মানুষকে সে পথ থেকে সরিয়ে এনেছে। সোজা কথায় বলা যায়, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সাংসারিক প্রাত্যহিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। তারা খেয়ে-পরে আর সঞ্চয়ের কথা ভাবতে পারছেন না। সঞ্চয় বিমুখ হয়ে পড়েছেন তার বিদ্যমান প্রতিকুল পরিস্থিতিতে। অনেকে আগের জমিয়ে রাখা অর্থ ব্যয় করছেন এখন সংসারের প্রাত্যহিক জরুরি খরচ মেটানোর জন্য। তারা এখন ব্যাংকে তাদের বিভিন্ন হিসাব নতুন করে টাকা রাখতে পারছেন না। বরং অনেকেই তাদের এফডিআর এবং ডিপিএস হিসাব বন্ধ করে জমানো টাকা তুলে ফেলছেন। আবার অনেকে ব্যাংকে না রেখে টাকা নিজের কাছে রেখে দিচ্ছেন। এটা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মোটেও কাঙ্খিত নয়। এর প্রভাবে অর্থনীতিতে বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। বর্তমান উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে বেশির ভাগ মানুষ। তারা অনেকটা বাধ্য হয়ে সঞ্চয় বিমুখ হয়ে যাচ্ছেন, ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। যারা চাকরি করছেন, তাদের কারো কারো বেতন কমে গেছে। ফলে সংসার চালিয়ে বাড়তি টাকা সঞ্চয়ের কথা ভাবা যাচ্ছে না।

দেশের অর্থনীতিতে সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানতের বড় অবদান রয়েছে। এই দুইটি জায়গা বিদ্যমান করোনাকালীন পরিস্থিতিতে বেশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। দিনে দিনে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে অনুমিত হচ্ছে। ব্যাংকগুলো সাধারণ আমানতকারীদের সঞ্চিত অর্থ ঋণ প্রদানের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হাল নাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে ৩৫ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে যা ৭১ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ৪৯ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা অথচ বিদায়ী অর্থবছর ২০১৯-২০তে বিক্রি হয়েছে ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। এমনিতেই গত অর্থবছরে সরকার সুদের হার কমিয়ে দিয়ে সঞ্চয়পত্রের লাগাম কিছুটা টেনে ধরার চেষ্টা করে। তখন থেকেই সাধারণ সঞ্চয়কারী মানুষ সঞ্চয়পত্রের প্রতি আগ্রহ হারাতে থাকে। তেমন পরিস্থতিতে করোনা মহামারির সংকট এসে মানুষকে আরো বেশি বিমুখ করে তুলেছে এ ব্যাপারে।

সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনে টাকা বিনিয়োগের সক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি ব্যাংকের বিভিন্ন সঞ্চয়ী স্ক্রিমেও টাকা জমা রাখছেন না আগের মতো। তারা ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়ে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে নিজের কাছে টাকা রাখাটাকে অনেক নিরাপদ মনে করছে। স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। মানুষ আজকাল ব্যাংকে টাকা জমা না রেখে বরং বেশি তুলে ফেলছে। নতুন করে রাখছে না ভবিষ্যতের জন্য। বিদ্যমান অনিশ্চিত সামাজিক পরিস্থিতির কারণেই এমনটি ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন। গত ছয় মাসে ব্যাংক বহির্ভূত জনগণের কাছে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

দেশের মানুষ ব্যাংক বিমুখ হলে এবং ব্যাংকে আমানত কম রাখলে ব্যস্টিক এবং সামষ্টিক উভয় অর্থনীতির ওপরই বিরূপ প্রভাব পড়ে। আশঙ্কার বিষয় হলো, ব্যাংক আমানত কমে গেলে ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে। তখন ব্যাংক উদ্যোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দিতে পারবে না। উদ্যোক্তারা ঋণ না পেলে দেশে বিনিয়োগ কমে যাবে। এমনিতেই দেশে বেকারত্ব প্রকট হয়ে উঠছে বিরাজমান করোনা সংকটের কারণে। কর্মহীন হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। এ অবস্থায় যদি নতুন বিনিয়োগের ব্যবস্থা না করা যায় তাহলে গোটা অর্থনীতিতে গভীর সংকট নেমে আসবে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। সবার আগে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষগুলোর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা চাকরি হারিয়ে ঘরে বেকার বসে আছেন কিংবা গ্রামে স্ব-পরিবারে ফিরে গেছেন তারা যাতে যে কোনো ব্যবসা শুরু করতে পারেন তার জন্য বিনা সুদের ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে যে অনাগ্রহ, বিমুখতা সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করে সঞ্চয়পত্রে আকৃষ্ট করতে নতুন উদ্যোগ নিতে হবে।