এই দায় কাহার?

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২০, ২১:৫৩

কাজ ফেলিয়া ঠিকাদার লাপাত্তা! এই ধরনের সংবাদ অনুসন্ধানে বিপুল তথ্য পাওয়া যাইবে। ঠিকাদারদের কাজের অনিয়ম, রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের ঘটনা নূতন নহে; কিন্তু ঠিকাদাররা কেন মধ্যপথে কাজ ফেলিয়া লাপাত্তা হইয়া যাইবেন? জানা যায়, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) ২৭ কোটি টাকার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ ফেলিয়া ঠিকাদার ‘উধাও’ হইয়া গিয়াছেন। পটিয়া উপজেলার শিকলবাহা খালের উপর নির্মিতব্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর নামাঙ্কিত সেতুটি ২০০৭ সালের ১৮ নভেম্বর ভাঙিয়া যাইবার পর নূতনভাবে নির্মাণের জন্য প্রথমবার ২২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয় সেতু মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কিছুদিন কাজ করিলেও এক পর্যায়ে কাজ বন্ধ করিয়া চলিয়া যান। সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) পটিয়ার প্রকৌশলী এই ব্যাপারে প্রথাগত কিছু বুলি আওড়াইয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, মেয়াদের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করিতে ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। এক জন সাব-ঠিকাদার কিছুদিন কাজ করিয়া তাহা বন্ধ রাখিবার কারণে মূলত এই সমস্যা হইয়াছে।

অর্থাত্ যিনি কাজ পাইয়াছেন তিনি আরেক জনকে সাবকন্ট্রাক্ট দিয়াছেন। ইহার পূর্বে আমরা রাজশাহী-নওগাঁ ৭৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কটির সংস্কার কাজের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিয়ম দেখিয়াছি। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার প্রকল্পটি ১২টি প্যাকেজে ভাগ করা ছিল; কিন্তু কাজ শেষ না করিয়াই তিনটি প্যাকেজের দুই ঠিকাদার প্রায় ৩০ কোটি টাকা বিল তুলিয়া লইয়া লাপাত্তা হইয়া গিয়াছিলেন। কয়েক বত্সর পূর্বে নরসিংদীর তিন উপজেলার প্রায় ৩০০ বিদ্যালয়ে নলকূপ স্থাপন ও শৌচাগার নির্মাণের কাজ পাওয়া ঠিকাদার তিন বত্সরে গড়ে ৫০ শতাংশেরও কম কাজ শেষ করেন। অথচ সেই ঠিকাদার পুরা কাজের টাকা তুলিয়া লইয়াছেন! অতঃপর কাজ বন্ধ রাখিয়া লাপাত্তা হইয়া গিয়াছেন! এমন অসংখ্য ঘটনা দেশ জুড়িয়া বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া ঘটিয়া চলিতেছে। সমগ্র দেশে প্রায় লক্ষাধিক ঠিকাদার রহিয়াছেন। তাহাদের সকলকেই কমবেশি আন্ডারহ্যান্ড ডিলিং করিতে হয় বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। ঠিকাদারদের কাজের মান দেখভাল করিবার জন্য প্রতিটি পর্যায়ে প্রকৌশলী রহিয়াছেন; কিন্তু ঠিকাদাররা যাহাতে মানসম্মত উপায়ে নির্মাণকাজ করেন, তাহার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও কি ঠিকমতো কাজ তদারকি করেন? ঠিকাদাররা বহু ক্ষেত্রেই সাবকন্ট্রাক্টে কাজ হস্তান্তর করিয়া দেন। অথচ আইনত তাহা করা যায় না। ইহাও কাজ নিম্নমানের হইবার একটি বড় কারণ। ঠিকাদাররাও অনেক ক্ষেত্রে সুযোগ বুঝিয়া টাকা তুলিয়া লাপাত্তা হইয়া যান। এই সকল ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কালো তালিকাভুক্ত করিবার কথা; কিন্তু অনিয়মের মহাস্তূপের বিপরীতে কয়জন ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করা হইয়াছে? এই দায় কি প্রকৌশলীরা এড়াইতে পারেন?

সত্যিকার অর্থে, বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে সরকারের অনেক কাজেই মানরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত হইবার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, এই ধরনের অনিয়ম বন্ধে কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায় না। যদি এই ধরনের অনিয়মের অভিযোগগুলি যথাযথভাবে তদন্ত হইত এবং শাস্তির বিধান করা যাইত, তাহা হইলে প্রায়শই এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হইত না নিশ্চয়ই।