করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবায় প্রায় চার মাস ধরে বন্ধ উপমহাদেশের কৃষি শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। ১২৩০ একরের সবুজ অরণ্যে আজ সুনশান নীরবতা। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনলাইন পাঠদানও শুরু হয়নি এখানে। তাহলে কীভাবে কাটছে বাকৃবি সারথিদের করোনাকালীন সময়। তাদের মতামত তুলে ধরেছেন— মুসাদ্দিকুল ইসলাম তানভীর
মিলব প্রাণের স্পন্দনে
কোভিড-১৯ সংক্রমণের ফলে থমকে যাওয়া জীবনে সবাই হয়তো ঘরবন্দী হয়ে মনে মনে স্মৃতিচারণ করছেন কর্মব্যস্ত সেই দিনগুলো। একটাই অপেক্ষা কবে সুস্থ হবে পৃথিবীর মানুষ, ফিরব আবার মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে। আমাদের ক্যাম্পাসে ছুটির ঘণ্টা বেজেছিল ১৭ মার্চ। সেই থেকে আজও ফেরা হয়নি সেই চেনা বিচরণ ক্ষেত্রে। করতে হচ্ছে না সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ক্লাস, প্র্যাকটিকাল। জমে উঠছে না জব্বারের মোড়ে, রেললাইনে, প্লাটফর্মে চায়ের কাপে কিংবা কেআর মার্কেটের ৩ টাকার দোকানের সামনে আড্ডা। বাকৃবির ফলগুলো, বর্ষার সৌন্দর্য্য উপভোগ করারও কেউ নেই। সারাদিন ক্লাস শেষে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বসে একসঙ্গে নদী, পাখি প্রকৃতি দেখারও কেউ নেই। খুব মনে পড়ে ক্যাম্পাসের অবাধ বিচরণের দিনগুলো, হলে কাটানো রাত আর কাছের মানুষের কথা। সবাই সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা করি, সুস্থ হোক পৃথিবী ফিরবো আবার প্রাণের ক্যাম্পাসে, মিলবো প্রাণের স্পন্দনে। শোণিত লহরীত উচ্ছ্বাস পুলোকিত প্রাণে মিলিত হব সবাই মিলে আবারও।
রাকিব হাসান রনি
২য় বর্ষ, ভেটেরিনারি অনুষদ
শেকড়ে সময় দিচ্ছি
বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে প্রায় সবাই নিজের ঘরে অলস সময় পার করছে। ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা আর নেই। এরই মধ্যে অনেকে অনেকভাবে সময় পার করলেও আমি কিন্তু শেকড়েই সময় দিচ্ছি। নিজের পরিবারই তো শেকড়। যখনই সুযোগ পাই মা-বাবাকে সময় দিই। ঘরের টুকিটাকি কাজ করা, বাগানের পরিচর্যা, বাবা-মার সেবায় ওষুধ পানি এগিয়ে দেওয়া, বাজার করা—এসব এখন আমার দায়িত্বে। পাশাপাশি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছোট ভাইকে পড়াশোনায় সাহায্য করি। আমার বাবা একজন স্কুল শিক্ষক। তার স্কুলে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনলাইনে ক্লাস নিতে তাকে যথেষ্ট কাঠ-খড় পোড়াতে হচ্ছে। চেষ্টা করি তাকে অনলাইন ক্লাস নিতে সাহায্য করার। মাকেও ফেইসবুক আইডি খুলে দিয়েছি। তার ইচ্ছা আমি ভার্সিটিতে গেলে ভিডিও কলে কথা বলবে। নিজেও কিছু অনলাইন কোর্স করছি। অনেক বিষয়ে জানার ইচ্ছা ছিল, শেখার ইচ্ছা ছিল। এতদিন ব্যস্ততার কারণে তা হয়ে ওঠেনি। এখন চেষ্টা করছি সেই ইচ্ছা পূরণের। প্রায় তিন বছর পর পরিবারের সঙ্গে একটানা এতদিন।
সামিত ইবনে কিবরিয়া
৩য় বর্ষ, পশুপালন অনুষদ
সেশনজট নিরসনে পদক্ষেপ নিতে হবে
করোনাকালীন এই সময়টা গ্রাস করে দিয়েছে স্বাভাবিক জনজীবনকে। তেমনি স্থবির হয় পড়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম। যার মাশুল গুনতে হবে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে সেশনজট নামক করাল থাবার কারণে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেশনজট নিরসনে সব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। চলমান সেশনের কোর্সগুলোর পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রেখে নতুন সেশন অনলাইন ভিত্তিতে আরম্ভ করা যেতে পারে। করোনা পরবর্তীকালে অন্য সেশনের কোর্সের সঙ্গে ভাগ ভাগ করে যুক্ত করে সেশনজট নিরসনে কাজ করা যেতে পারে। যদিও এই পদ্ধতিতে ১ম-৩য় বর্ষের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। পাশাপাশি অন্যরাও উপকৃত হবে বলে আমি মনে করি। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সেশনজট নামক অভিশাপ থেকে কিছুটা হলেও রেহায় পাবে। সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করার সুযোগ পাবে। যা দেশের এই ক্রান্তিকালে কিছুটা স্বস্তির খবর হতে পারে।
মো. ইফতে খারুল ইসলাম
২য় বর্ষ, ভেটেরিনারি অনুষদ
জীবনধারায় পরিবর্তন এসেছে
দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে মাত্র দুই মাসের স্মৃতিগুলো ফিকে হয়ে আসছে। আমরা এই বছরই সবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করেছিলাম। ক্যাম্পাস বন্ধের প্রথম মাসটা একটু পড়াশোনা করেছি, তারপর ছুটি বাড়তে থাকায় পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যায়। দীর্ঘ বিরতির ফলে সেশনজটের শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তবু্ও আমাদের এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য আরো কিছুদিন সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। কারণ সব কিছুর আগে জীবন। আমাদের মতো তরুণদের উচিত নিজেদের পাশাপাশি আশেপাশের মানুষদের সচেতন করা, করোনা মোকাবিলার যোদ্ধা হিসেবে নিয়োজিত করা। চলাফেরায় অনেক পরিবর্তন আসবে সেটা অনুমান করাই যায়। হয়তো পরিবর্তন আসবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে হয়তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে না। আর খোলার পর আমাদের ফ্যাকাল্টি, শ্রেণিকক্ষ, আবাসিক হলসহ সর্বত্র স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতন থাকতে হবে। বিশেষত যারা হলের গণরুমে থাকে তাদের ঝুঁকি বেশি। শিক্ষার ক্ষতি কমানোর জন্য আমাদের সিলেবাস কমানো অথবা আমাদের ক্লাসের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
শাহরিয়ার আরাফাত তালহা
১ম বর্ষ, মত্স্যবিজ্ঞান অনুষদ
