জাতিসংঘেই অসহায় গণতন্ত্র!

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২০, ২১:৫৬

বিশ্বের স্বাধীন জাতিসমূহের সর্ববৃহত্ সংগঠন জাতিসংঘের সঙ্গে প্রায় সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘গণতন্ত্র’ প্রত্যয়টির সৃষ্টি হয়েছে এক অটুট সহযোগ। জাতিসংঘ তথা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে বিভিন্ন সময় থেকে আজ অবধি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজতন্ত্র কিংবা স্বৈরশাসকের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, আবার কখনো সংকটময় অবস্থা থেকে গণতন্ত্রের উত্তরণ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবতীর্ণ হয়েছে এক অনন্য ভূমিকায়।

গণতন্ত্র হলো এমন একটি প্রত্যয় যেখানে সবাই সমান বলে বিবেচিত হয়। যেখানে থাকবে সবার অংশগ্রহণ ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, যা গণতান্ত্রিক চর্চার প্রধান একটি নিয়ামক। এটার একটি খণ্ড চিত্রের চিত্রায়ণ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে থাকলেও, মূল নীতিনির্ধারণে গণতান্ত্রিক চর্চা কতটুকু? জাতিসংঘের একটি অঙ্গভাগ হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদ। আর এই নিরাপত্তা পরিষদের সিংহাসনে মুকুটধারী বিশ্বের পঞ্চশক্তি (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন)। যারা জাতিসংঘ সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে আজ অবধি এক অকাট্য আধিপত্যের আসনে আসীন রয়েছে। যাদের রয়েছে ‘ভেটো ক্ষমতা’ নামক এক বিশেষ সুবিধা। ভেটো শব্দটি ল্যাটিন ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে ‘আমি মানি না’। ভেটো ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে পঞ্চশক্তির যে কোনো একটি দেশ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত যে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আইন প্রণয়ন অনুমোদনে বাধা প্রদান করতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে এই পাঁচটি দেশ এই ভেটো নামক বিশেষ সুবিধার অধিকারী এবং বৈশ্বিকভাবেও এটি বিরাট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম, যা তারা ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থ ও সুযোগ বুঝে। যেখানে গণতন্ত্র মানে সবাইকে (সব সদস্যকে) সমান সুযোগ দেওয়া, সেখানে এই বিশেষ সুবিধা কি জাতিসংঘের আন্তঃগণতন্ত্রকে প্রশ্নের সম্মুখীন করছে না? এখানেই নাটকীয়তার শেষ নয়! জাতিসংঘের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক প্রধান হলেন মহাসচিব। যিনি একটি সুষ্ঠু প্রশাসনিক পরিকাঠামোর আওতায় যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা অনুসারে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে সংঘের বিভিন্ন শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এখানেও রয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রভাবশালী সদস্যদের প্রভাব।

সম্প্র্রতি সুদানে গণতন্ত্র উত্তরণবিষয়ক, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নবগঠিত ‘ইউনাইটেড নেশন্স ইন্টেগ্রেটেড ট্রানজিশন অ্যাসিসট্যান্স মিশন ইন সুদান’ মিশনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য মিশন অভিজ্ঞ দুই জনের নাম প্রস্তাব করেন। যা ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন কর্তৃক নাকচ করে দেওয়া হয়। এছাড়া ২০১৭ সালে ঘটে এমনই এক ঘটনা, যেখানে মহাসচিব গুতেরেস, লিবিয়া মিশনের বিশেষ দূত হিসেবে ফিলিস্তিনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সালাম ফায়েদকে মনোনীত করেন, যা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিল। পর্যবেক্ষকদের মতে, গত তিন বছরে জাতিসংঘ মিশনগুলোর প্রধানেরা বৃহত্শক্তিগুলোর পছন্দের ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন।

অন্যদিকে জাতিসংঘ সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল আফ্রিকা নয়, ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের নিয়োগেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা আরোপ করেছে। তাদের উদ্দেশ্য জাতিসংঘ মিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তাদের নির্ধারিত লোক থাকবে। প্রায় এই রকম উচ্চাকাঙ্ক্ষা ফ্রান্সেরও রয়েছে। তাদের চাওয়া, ফরাসিভাষী এমন কোনো আফ্রিকান দেশ থেকে ঐসব পদ পূরণ করা হোক, যার মাধ্যমে তারা নিজ নিজ প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। যা রীতিমতো নব্য উপনিবেশবাদ চর্চা ও নেপোটিজমের নামান্তর।

যদিও আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘের মহাসচিব নিয়োগ প্রাপ্তির পর থেকে তিনি বৃহত্ শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে অন্যান্য দেশ হতে এই শীর্ষ পদগুলো পূরণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের মধ্যে সূক্ষ্ম রাজনৈতিক অন্তঃকোন্দল, নেপোটিজম ও নব্য উপনিবেশবাদের হেতু তা বারবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে একদিকে যেমন জাতিসংঘের প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়াটিও উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে জাতিসংঘের আন্তঃগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াসহ শান্তিরক্ষা মিশনের ক্ষেত্র দেশগুলোতে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়