শ্রদ্ধাঞ্জলি

‘তার ছিল শিশুর মতো মন’

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২০, ২১:৩১

 

আপনার আম্মা কেমন আছে? আপনি খুব ভাগ্যবান। আপনার আম্মা আপনার সঙ্গে আছেন। মায়ের যত্ন নিবেন। আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। আরেকজন আরডি ছিলেন। খুরশিদ আলম চৌধুরী। তাকেও আমার খুব ভালো লাগতো।—এই কথাগুলো যিনি বলতেন তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। ৮০ বছরের এক তরুন যুবা যেন আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিল! বয়স ৮০ হলেও মন-মানসিকতা আর চিন্তা ভাবনায় তিনি ছিলেন ২৫ বছরের বলিষ্ঠ যুবক। বলছিলাম বিশিষ্ট বেতার ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, গীতিকার, ছড়াকার, সাহিত্যিক, সংগঠকসহ বহুগুণে গুণান্বিত আমাদের সকলের প্রিয় শহীদুর রহমান বিশু ভাইয়ের কথা। এই আগষ্ট মাসেই তার সঙ্গে আমার বেশ কয়েকটি কাজ করার কথা ছিল। তিনি রাগপ্রধান গান রচনা করছেন। এগুলো রাজশাহীর এক নজরুল শিল্পীকে দিয়ে করাবেন। বাংলা গজল লিখেছেন, কাওয়ালী শিল্পী দিয়ে করাবেন। এমনই কথা ছিল। বলেছিলাম, ঈদের পরপরই আমরা আগের মতো পুরো প্রোগ্রামে যাচ্ছি তখন এগুলো করা যাবে। আর হ্যাঁ, আপনি আমাকে নাটক দিন, নাটক করবো। নাটকও তিনি লিখছিলেন। কিন্তু সেটা আর হলো না। সবাইকে কাঁদিয়ে এভাবেই তিনি আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলেন। জীবনে অনেক কিছুই করেছেন বিশু ভাই। এমনকি অভিনয় করেও প্রশংসা পেয়েছেন। ‘হারানো দিন’ ছায়াছবির বিখ্যাত অভিনেতা নায়ক রহমান তার অভিনয়শৈলীতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। ‘মিলন’ ছবিতে তার সঙ্গে অভিনয়ও করেছেন। একথা তিনি মাঝে মাঝেই বলতেন। বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ লাখী আকন্দের সঙ্গে ছিল তার বেশ ভালো সম্পর্ক। রংপুর বেতারে পোস্টিংকালীন একসঙ্গে গান করেছেন। লাখী আখন্দ তার বাসায় থেকেছেন, খেয়েছেন। রেডিওর সঙ্গে ছিল তার আজীবনের সম্পর্ক। ১৯৬৬ সালে শুরু। রাজশাহী বেতারে তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে। তারপর বেতারের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করেছেন সদর্পে। কথিকা, গান, গীতিনকশার পাণ্ডুলিপি, নাটকে অভিনয়, নাটক লেখা, কবিতা, ছড়া, ছোটদের অনুষ্ঠানের পাণ্ডুলিপি কত কি। তার ছিল শিশুর মতো মন। তাই তো শিশুদের নিয়ে কত ছড়া লিখছেন। কত গল্প হতো আমাদের মাঝে। পানি উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি করতেন তিনি। সেই চাকরির কথা, পরহেজগার বাবার কথা, তার উপদেশের কথা, আধ্যাত্মিক কিছু ক্ষমতার কথা, স্ত্রী, ছেলে ও ভাইয়ের কত কথাই না তিনি বলতেন। সব আজও চোখের সামনে ভাসছে। ইসলামি গান, গজল নিয়ে তার বেশ আগ্রহ ছিল। একবার শাকিল কাওয়ালের এক দলকে ধরে নিয়ে আসলেন এক সন্ধ্যায়। আমরা বেতার পরিবার শাকিল কাওয়ালের পরিবেশনায় তার লেখা ইসলামি গান ও কাওয়ালি উপভোগ করলাম। সবই এখন স্মৃতি। আর কে এভাবে গান শোনাবে? তিনি সৃষ্টিশীল লোক ছিলেন। সৃষ্টি নিয়ে নানা ভাবনা ছিল তার। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় ছিল অবাধ বিচরণ। উপন্যাস লিখেছেন, আমাকে উত্সাহিত করেছেন পড়তে। এমনকি পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে এসেও আমাকে পড়তে দিয়েছেন। ইতিহাস নিয়েও তার কৌতুহলের শেষ ছিল না। গল্প করতেন জমিদারদের কথা। একবার তো তার কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সঙ্গে সঙ্গে শ্যামপুরে বেড়িয়ে পড়েছিলাম প্রাচীন জমিদারবাড়ি দেখতে। সঙ্গে নিয়েছিলাম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. শফিক আশরাফকে। দুই ভাই-বন্ধুর সেদিনের ভ্রমণের কথা বারবারই মনে পড়ছে আজ। তিনি খুব যত্ন করে স্ক্রিপ্ট লিখতেন। যে কথিকাই দেওয়া হোক না কেন, সেটা নিয়ে পড়াশোনা করে তারপর লিখতেন— বর্তমানে যার বেশ অভাব। হাতের লেখাও ছিল চমত্কার। ঈদের পরে রাগপ্রধান গানগুলো করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা আর হলো কই? কষ্টই রয়ে গেল শুধু।  তিনি নবীন লেখকদের উত্সাহিত করতেন। অনেককে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন আমার কাছে। এই আমাকেও তিনি লেখার জগতে নিয়ে আসার কত চেষ্টা করেছেন। আমার চীন ভ্রমণ নিয়ে শহীদুর রহমান ভাইয়ের ছিল দারুণ আগ্রহ। আমাকে লিখতেই হবে সেই ভ্রমণ কাহিনি। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ পড়তে দিয়েছেন; তবু আমাকে লিখতে হবে। চীন ভ্রমণের সময় ডায়রি লিখেছিলাম। মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে। তার কর্মের ব্যাপ্তি বিশাল। সাহিত্যের প্রতিটি স্তরে তার ছোঁয়া রয়েছে। তার লেখা গান যুগ যুগ ধরে গাইবে শিল্পীরা। তার লেখা নাটক শ্রুত হবে শ্রোতার মাঝে। সাহিত্য পঠিত হবে পাঠকের মাঝে। এভাবেই তিনি বেঁচে রবেন আমাদের অন্তরে।

লেখক : ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ

আঞ্চলিক পরিচালক (দায়িত্বপ্রাপ্ত), বাংলাদেশ বেতার, রংপুর।