জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে অনুপম বৈশিষ্ট্যের দাবিদার। লালচে মাটির বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা নানাবিধ বৃক্ষের সমাহার, অজস্র পাখির অবিরত কিচিরমিচির, পিচঢালা রাস্তায় অহিংস্র বন্যপ্রাণীর স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ, লাল পদ্ম ফোটা লেকের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, পরিযায়ী পাখির আগমন, শিয়ালেরডাক, হরেক প্রজাতির ফুলের সৌন্দর্য ক্যাম্পাসকে করেছে অনন্য। যে কেউ প্রথম দেখায় খুব সহজে এ ক্যাম্পাসের প্রেমে পড়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক সুবিধা হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য যে কয়েকটা হল রয়েছে এর মধ্যে আফম কামালউদ্দিন হল অন্যতম। শিক্ষার্থীদের কাছে হলটা ‘হোয়াইট হাউজ’ নামে পরিচিত; ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাবের জন্য। শুধু কি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে? না, পড়াশোনা, সাংবাদিকতা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ সহশিক্ষার ক্ষেত্রেও এ হলের ছেলেরা এগিয়ে।
কনকনে শীতের সকাল, কুয়াশার চাদরে মুড়ানো ক্যাম্পাস; বিশ্ববিদ্যালয় মূল ফটকে এসে বাস থেকে নেমে প্রশাসনিক ভবনে গিয়ে জানতে পারি ‘হোয়াইট হাউজ’ খ্যাত এই হলে আমার ক্যাম্পাস জীবন কাটাতে হবে। চারদিকে অপরিচিত মুখ, পরিবার ছেড়ে আসার বেদনা, আবাসন সংকট, ডাইনিং-ক্যান্টিনের নিম্নমানের খাবার, ক্যাম্পাসের যার্গিং ভীতি সব মিলিয়ে ভীষণ মন খারাপ করতাম। সবসময় মনে হতো কবে ক্যাম্পাস ছুটি হবে, কবে বাড়ি যাবো। কিন্তু সময়ের সাথে মনের অজান্তে অপছন্দের এ জায়গাটি এত প্রিয় হয়ে উঠলো যে ছুটি পেলেও মাঝে-মাঝে হলেই থাকতাম, বাড়িতে যেতাম না। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কেটেছে এই আফম কামালউদ্দিন হলের রাজকানন ব্লকের ২০৭ নম্ব্বর রুমে।
হল জীবন মানেই অবাধ স্বাধীনতা। সিনিয়র-জুনিয়র মিলে একসঙ্গে আড্ডা দেওয়া, ছাদে বৃষ্টিতে ভেজা, রাতের জ্যোত্স্না উপভোগ করা, বন্ধুরা মিলে হঠাত্ কোথাও ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুরা মিলে চাঁদা তুলে ক্যাম্পাসের কোথাও চড়ুইভাতির আয়োজন করা, হলের টিভি রুমে খেলা দেখা, বাংলাদেশ জিতলে দলবেঁধে আনন্দ মিছিল করা, রাত জেগে কেরাম খেলা, কমনরুমে সবাই মিলে নিয়মিত পত্রিকা পড়া,
পহেলা বৈশাখ বা কোনো অনুষ্ঠানে সবাই মিলে দল বেঁধে ঘুরতে বের হওয়া আরো কত কী! হল জীবনে উত্সবের কোনো শেষ নেই। তবে উত্সবগুলোর মধ্যে অন্যতম কারো জন্মদিন পালন করা। হলের কোনো বন্ধু বা জুনিয়রের জন্মদিন পালন করা হয় খুব মজা করে। তাকে না জানিয়ে সবকিছু আয়োজন করে ঠিক রাত ১২.০১ মিনিটে সবাই মিলে হাজির হয় তার রুমে। তারপর হৈ-হুল্লোড় করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো, কেক কাটা, আনন্দ-উল্লাস করা হয়। তবে যারা জন্মদিন পালন করে তাদের জন্য উত্সব হলেও যার জন্মদিন তার জন্য খুব একটা সুখকর না। শীতের মধ্যরাতে কারো মাথায় ডিম ফাটলে তার জন্য জন্মদিন কীভাবে সুখকর হবে? হলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে কুপন কেটে দলবেঁধে ডিনার করা সবই যেন এক একটা উত্সব। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পূর্ণতা এনে দেয় এই হল জীবন। পড়াশোনার পাশাপাশি একজন শিক্ষার্থীর কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়, আর সবার সাথে কীভাবে সুন্দরভাবে মিলেমিশে থাকা যায় হল জীবনে এ শিক্ষা পাওয়া যায়।
ক্লাস- পরীক্ষা বাদে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবকিছুই মজার! ক্যাম্পাস জীবনের সেই প্রথম থেকেই একটা কথা, কবে পড়াশোনা শেষ হবে, কবে বের হবো। সেই আক্ষেপের শেষ হয়ে এসেছে। ক্লাস- পরীক্ষা থেকে মুক্তি মিলেছে কিন্তু এখন শান্তি পাচ্ছি না। প্রিয় ক্যাম্পাস ও হল ছেড়ে চলে যেতে হবে এটা ভেবে মনের মধ্যে শূন্যতা ভর করছে। এ শূন্যতা প্রিয়মুখগুলো ছেড়ে যাওয়ার বেদনা, এই শূন্যতা দ্বিতীয় জন্মের আঁতুরঘর ছেড়ে যাওয়ার বেদনা।
