ছোট্টুর স্বপ্ন

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২০, ১৯:৩৫

বিকেলের নরম রোদে বারান্দা ভরে গেছে। বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ছোট্টু মাথা বের করে দিয়েছে। ঝিরঝির বাতাসে ও টুসটুস করে মাথা দোলাচ্ছে। রাস্তার ওপারে একটা বড়ো গাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছটার দিকে তাকিয়েই ছোট্টুর মায়ের কথা মনে পড়ে যায়।

ছোট্টু মাটি ফুঁড়ে বের হয়েই মাকে দেখেছে। মায়ের বিশাল বড়ো শরীর দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছে সে। কত বড়ো তার মা! কত ডালপালা! প্রতিদিন কতশত পাখি তার মায়ের ডালে বসে কিচির মিচির করে। পাকা পাকা লাল ফল খায়। তারপর ডানা মেলে উড়ে যায়। ক্লান্ত পথিক মায়ের ছায়ায় বসে জিরিয়ে নেয়। এসব দেখে গর্বে মন ভরে ওঠে ছোট্টুর। মা বলে তুইও একদিন আমার মতো বড়ো হবি। মায়ের কথা শুনে খুশিতে ডগমগ করে ছোট্টু। কিন্তু হঠাত্ একদিন কিছু লোক এল। তাদের কাছে অনেক রকম দা-কুড়াল। ওরা মায়ের সবগুলো ডাল কেটে দিল। মা চিত্কার করে কাঁদতে লাগল। কিন্তু ওরা মায়ের কষ্ট বুঝল না। মাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলল।

মা চলে যাওয়ার পর নিজেকে খুব একা মনে হতো। খুব ভয় হতো। একদিন আমার মতো ছোট্ট মিষ্টি বাবার হাত ধরে ঘুরতে ঘুরতে আমার সামনে এল। তারপর সে আমার কচি কচি পাতায় আদর করে দিল। অনেকদিন পর তখন আমার খুব ভালো লাগছিল। একসময় মিষ্টি আমাকে বাসায় নিয়ে আসার জন্য বায়না ধরল। ওর বাবা বলল, ‘মা এটা বটগাছ। আমাদের বাসায় তো এটা লাগানোর জায়গা নেই। এটা মাটিতে লাগাতে হয়।’

‘বাবা, আমি ওকে টবে লাগাবো। পানি দেবো, যত্ন নেব। তুমি ওকে নিয়ে চলো।’

‘না মা, এটা টবে লাগালে বাঁচবে না।’

‘তুমি দেখো চারাটা ঠিক বাঁচবে।’

চার বছরের মিষ্টির কাছে হার মেনে বাবা অবশেষে আমাকে বাড়িতে নিয়ে এল। আমাকে বাড়ি এনে সে কী খুশি মিষ্টি! কিন্তু ওর মা মুখ ফুলিয়ে থাকল। তার শখের বারান্দায় সুন্দর সুন্দর ফুল গাছ লাগানো আছে। গোলাপ, বেলি, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকাসহ আরো এত সুন্দর ফুল! এসবের পাশে একটা বটগাছের চারা খুব বেমানান। তবুও মেয়ের খুশির জন্য তিনি আমাকে টবে লাগিয়ে বারান্দায় রাখলেন। আমাকে মিষ্টি খুব ভালোবাসে। আমার নাম দেয় ছোট্টু। প্রতিদিন সে আমাকে পানি দেয়। আমার  নতুন পাতা গজালে ও নেচে ওঠে।

মিষ্টির খুশি দেখে ওর বাবা-মাও আমাকে ভালোবেসে ফেলল। মা মাঝে মাঝে আমার পাতায় হাত বুলিয়ে দেয়। আমার গোড়ায় সার মাটি দেয়, পানি দেয়। আমার তখন ভীষণ মায়ের কথা মনে পড়ে।

একদিন একটা দুষ্টু ছেলে মিষ্টিদের বাড়িতে বেড়াতে এল। এসেই পটাপট আমার দুটো পাতা ছিঁড়ে ফেলল। কী যে ব্যথা পেয়েছিলাম তখন! ইচ্ছে করছিল চিত্কার করে বলি—আমি ব্যথা পাচ্ছি। কিন্তু আমাকে কিছুই বলতে হলো না। মা সেদিন ছেলেটাকে অনেক কথা বলেছিল।

‘গাছের জীবন আছে। অকারণে গাছের পাতা ছিঁড়তে হয় না। আমাদের চুল ছিঁড়লে যেমন আমরা ব্যথা পাই তেমনি গাছের পাতা ছিঁড়লেও গাছ ব্যথা পায়।’

মায়ের কথা শুনে দুষ্টুটা দাঁত বের করে হাসল। মা ওকে ধমক দিয়ে বলেছিল, ‘তুমি সন্ধ্যাবেলা গাছের পাতা ছিঁড়েছ কেন? তুমি জানো না মাগরিবের আজানের পরে গাছেরা আল্লাহর জিকির করে? রাতে গাছের পাতা ছেঁড়া নিষেধ। তবুও যদি কোনো বিশেষ প্রয়োজনে গাছের পাতা ছিঁড়তে হয় তাহলে গাছের অনুমতি নিতে হয়।’

মায়ের কথা শুনে সেদিন খুব ভালো লেগেছিল।

আস্তে আস্তে আমি বড়ো হতে থাকলাম। আমার ডালপালাগুলো বাড়তে থাকল। একসময় মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট টবে আমি আর বেশিদিন থাকতে পারব না। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার মতো মিষ্টিরও এমন চিন্তা হতে লাগল।

অবশেষে ওর বাবা আমাকে কোথায় যেন নিয়ে গেল। একটা লোক আমাকে তুলে শেকড় ছেঁটেছুঁটে কী সব লাগিয়ে দিল। তারপর আমাকে আবার এই টবে লাগিয়ে দিল। এরপর থেকে অনেক বছর পার হয়ে গেল আমি এই টবে আছি। আমার ডালগুলো আর বড়ো হয় না। চার বছরের মিষ্টি এখন এগারো বছরের হয়েছে। ওর তুলতুলে হাত পা এখন বড়ো হয়েছে। কিন্তু আমার ডালগুলো কেন বড়ো হয় না? আমাকে নাকি বনসাই বলে। কিন্তু আমি তো বনসাই হতে চাইনি। আমি তো আমার মায়ের মতো হতে চেয়েছি। আমি রোজ স্বপ্ন দেখি আমার একটা বিশাল দেহ হয়েছে। অনেক ডালপালা। পাখিরা ডালে বসে কিচির মিচির করছে। পথিক আমার ছায়ায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছে। আচ্ছা, কবে আমার স্বপ্ন পূরণ হবে? কবে আমি ছোট্টু থেকে মায়ের মতো ওমন বড়ো গাছ হব?