১৮ আগস্ট গণমানুষের বুদ্ধিজীবী যতীন সরকারের পঁচাশিতম জন্মদিন। বাবা ছিলেন শতায়ু। সে বিবেচনায় তিনি শতায়ু হোন—এটা আমাদের কায়োমনোবাক্যে প্রার্থনা। সংগ্রামী জীবন তাঁর। আপোসহীন তিনি। শাণিত চাকুর মতো ক্ষুরধার বক্তব্যে তিনি সম্যক পরিচিত। চিন্তার স্বচ্ছতায়, বিশ্লেষণের দৃঢ়তায়, স্বরভঙ্গির মহাপ্রাণতায় যুগের চাহিদা মিটিয়েছেন তিনি। লেখালেখিতে পঞ্চাশ পেরিয়ে তাঁর উদ্বোধন। ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। এ গ্রন্থ বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত এনে দিয়েছিল। তাঁর লেখ্যভঙ্গির দৃঢ়তায় পশ্চিমবঙ্গসহ বাংলা ভাষাভাষী বুদ্ধামহল এক নবীন তাত্ত্বিকের আগমনধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন। সেই পঞ্চাশেই ‘ভাগ’ আর ‘ভাগ্য’কে নিয়ে ‘ভজ্’ ধাতু মূল ধরে সমাজকে তার ঔচিত্যবোধের কথা জানাতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘ভাগ পাওয়ার অধিকার বা যোগ্যতাই হলো ‘ভাগ্য’। ছলে-বলে যারা সম্পত্তির মালিক বনে গেল, আর যারা মালিকানা থেকে বঞ্চিত হলো—এই দু’ শ্রেণির ‘ভাগ ও ভাগ্য’ হয়ে গেল সম্পূর্ণ দু’ রকম।’—মার্কসীয় এমন তত্ত্বকথা দিয়ে তিনি পরিপূর্ণ করেছেন তাঁর পরবর্তী ‘বাঙালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, ‘প্রাকৃতজনের জীবনদর্শন’, ‘মানব মন, মানবধর্ম ও সমাজ বিপ্লব’-এর মতো বহুল আলোচিত চল্লিশোর্ধ্ব গ্রন্থে। এ গ্রন্থনিচয় সমাজকে নাড়া দেয়, সাড়া জাগায়। অহেতুক কল্পবিলাসী বা স্মৃতিকল্প নয়; কেবল নক্ষত্রের শোভা; আকাশের নীলিমা নয়; মানুষের বুক চিতিয়ে রুখে দাঁড়াবার জমিন তৈরি করে তাঁর লেখা। দুটো বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’ এবং ‘পাকিস্তানের ভূতদর্শন’। জীবনীগ্রন্থ বলতে যে ব্যক্তি-উচ্চারণ পড়তে আমরা অভ্যস্ত—তার অবসান টেনেছেন তিনি। নৈর্ব্যক্তিক প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে মহাভারতের সঞ্জয়ের মতো যে বর্ণনা তিনি করেছেন, তাতে তত্কালীন সমাজ এবং সমাজের সকল ক্রান্তি এবং আশাব্যঞ্জকতা সকল মোহের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি লিখে গেছেন ছোট গল্পীয় ঢঙে টানটান উত্তেজনায়। সমাজ দর্শকের এ ভূমিকা পালন একান্তই বিরল। যাত্রাপালার বিবেক দ্যোতিত তাঁর অমোঘ উচ্চারণমালা এখানে একেবারেই স্বতন্ত্র এবং লক্ষ্যভেদী। এ জীবনী সমাজমানসের অমীমাংসিত বহু প্রশ্নের উত্তর জুগিয়েছে। দিকভেদী নাবিক তিনি। ধ্রুবতারা তাঁকে পথ দেখায়। এ ধ্রুবতারা তাঁর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। ফলে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে তাঁর জীবন পরিচালিত। পরিচালিত বলেই আর দশজন বুদ্ধিজীবী থেকে তিনি আলাদা। নিপীড়িত জনতার পক্ষে তাঁর শাণিত কলম এবং মুখশ্রুতি বেগবান। প্রগতিকামী তিনি। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী বিজ্ঞাননির্ভর ভাবনাকে সঙ্গী করে নিজ জীবন-কম্পাসকে লক্ষ্যভেদী করে তুলেছেন তিনি ক্রমাগত। শব্দ-বাক্যের দ্বৈত খেলায় মধ্যযুগীয় কবিদের মতো তাঁর রচনা প্রসাদগুণ পায়। এ শৈলীতে তাঁর প্রবন্ধ এক উঁচুস্তরে গিয়ে ঠেকেছে। তাঁর ‘নাস্তিকতা মুর্দাবাদ’, ‘বিজ্ঞান চেতনা জিন্দাবাদ’ যাঁরা পড়েছেন তাঁরা বুঝেছেন তাঁর ভঙ্গি, কী বোঝাতে প্রকৃতই কী বুঝিয়েছেন। প্রকৃত নাস্তিকতা আসলে কী, তার ব্যাখ্যা রসঘন হয়েছে এসব লেখায়। ‘প্রাকৃত জনের জীবনদর্শন’, যে মানবিক দর্শন; এবং বস্তুবাদী; তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ভারতীয় প্রাচীন বেদ থেকে বাঙালির চর্যাপদ, মধ্যযুগীয় গীতিকবিদের এবং লোককবিদের শরণ নিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে এক মানবিক পৃথিবীর পরম্পরা দেখতে এবং দেখাতে তিনি সচেষ্টও হয়েছেন। জেলখানায় বসে লেখা তাঁর একমাত্র নাট্যাঙ্কিকা ‘সব পাওয়ার মন্ত্র’ সমাজতান্ত্রিক আদর্শের আদলে বিপ্লবী চৈতন্যে উজ্জীবিত। তাঁর, ‘রবীন্দ্র অবলোকন’, ‘নজরুল ভাবনা’, ‘লালন’ কিংবা ‘রামপ্রসাদ’, ‘বিবেকানন্দ’, ‘রামমোহন’, ‘ডিরোজিও’, ‘বিদ্যাসাগর’ থেকে ‘আরজ আলী মাতুব্বর’ পর্যন্ত সকলেই চলার পথের আদর্শ সঙ্গী। তিনি জীবনের যে ছবি দেখতে চান, তাতে তা প্রমাণিত। আর সেই সত্য উদ্ঘাটনে কক্ষচ্যুত তো ননই, বরং তাঁর ঝঞ্ঝাপূর্ণ পথে কোনো উল্কাপতন নেই।
পাভলবীয় মনঃস্তত্ত্বকে তিনি অনুধাবন করেছেন সরলভাবে। এবং সে মনঃস্তত্ত্বের আলোকে তাঁর প্রবন্ধসমগ্র শুধু যুক্তিবাদীই নয়; হয়েছে বিশ্ব-আদর্শের কেন্দ্রভূমি।
চল্লিশ বছরের অধিক সময় তিনি শিক্ষকতা করেছেন; কিন্তু গতানুগতিক শিক্ষক নন। নন সাহিত্যেরও কলা-কৈবল্যবাদী। বরং বস্তুবাদী আদর্শিক গুরু তিনি। তিনি গণশিক্ষকও। গণশিক্ষক বলেই, তাঁর মাস্টারি বাগ্মীগুণ অসংখ্য শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে। আর এভাবে বহুজনের মানস-মুকুল প্রস্ফুটিত করে চলেছেন তিনি। তাঁকে জন্মদিনের প্রণতি।
যতীন সরকার, জন্ম :১৮ আগস্ট ১৯৩৬
